← Travel StoriesPondicherry, India · People & Place

ঊর্ধভী, পন্ডিচেরি উপকূল

পন্ডিচেরির এক ভোরে ঊর্ধভীর সঙ্গে সমুদ্রের পথে হাঁটা। পুরোনো ফরাসি শহর, উপকূলের বাতাস আর কিছু পরিচিত হয়ে ওঠার মুহূর্ত।

A traveler practicing yoga on the rocks beside the sea in Pondicherry
Pondicherry · Story photograph previously published in Ajker Patrika.

মেয়েটি আসলো ভোররাতে। প্রায় চারটার দিকে।

আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম দরজা বন্ধ করে। ভোরের ঘুম চোখে নিয়ে আমি দরজা খুলে দিলাম। সারা ঘর সৌরভে ভরে গেল। ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখলাম মেয়েটির মাথাভর্তি চুল। ছোট ছোট বেণি করা। মনে হচ্ছে সাপের বাচ্চা তার মাথায় কিলবিল করছে। নেমে এসেছে কাঁধ থেকে পিঠ পর্যন্ত। এসি চলেছে সারারাত। রুমে প্রায় পৌষ মাসের শীত। সে আমার কাছ থেকে কম্বলটা চেয়ে নিয়ে তা জড়িয়ে নিল গায়ে। তারপর ফোনে মনোযোগ দিল। নিঃসংকোচ। সহজ। আমি পা মেলে লম্বা হয়ে শুয়ে শুয়ে দেখছি। ঘুম কেটে গেছে আমার। সুন্দর সুঘ্রাণ আমাকে জাগিয়ে তুলছে ভেতর থেকে।

ভাবছি কোথায় শুয়ে আছি! আমি শুয়ে আছি ভারত মহাসাগরের কোলে। পন্ডিচেরি নামে এক প্রাচীন ফরাসি শহরে। সাদা সাদা বাড়ি। সুনসান রাস্তা। সমুদ্রের বাতাস শহরটিকে প্রতিনিয়ত সুরভিত করে রাখে। গলির পরে গলি। কাঠগোলাপ গাছ। যার হলুদ পাপড়ি ঝরে পড়ে বাতাসে। তারপর কালো পিচের রাস্তায় আলপনা তৈরি করে রাখে।

মাঝে মাঝে বড় বড় বৃক্ষের বাগান। মন্দির। গির্জা। রাস্তার দুই পাশে হোটেল। কফিশপ। মদের দোকান। আইসক্রিম পার্লার। লাইব্রেরি ও ইয়োগা সেন্টার।

আমি আরো কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করে উঠে বসলাম বিছানায়। মেয়েটিকে বললাম, ঘুম আসছে না আমার। চল সমুদ্রের পাড়ে হেঁটে আসি। ভোরের বাতাস খুব ভালো লাগবে।

সে গায়ের কম্বল নামিয়ে রেখে স্লিপার পায়ে দিতে দিতে বলল, চল যাই। আমি তাকে বললাম, এখান থেকে রক বিচে যেতে তিন-চার মিনিট লাগবে মাত্র।

সে আমাকে পরিচিত ঘরের মানুষের মতো বলল, তুমি পেছনে তাকাবে না। আমি কাপড় বদল করব। আমি বললাম আমি রুমের বাইরে যাই তাহলে। আমি পুরনো সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে ছাদে চলে আসলাম। এখানে বাড়িগুলো সব দুই/তিন তলা বিশিষ্ট। খুব উঁচু নয়। সূর্য এখনো ওঠেনি। তারপরেও আলো ছড়িয়ে পড়ছে আকাশের নিচে। এই শুভ্র শহরে। ভারত মহাসাগরের কূলে।

বড় স্নিগ্ধ, বড় পবিত্র। মায়াবি সকালের শুরু হয়েছে। ছাদের মাঝখানে একজন তরুণী ইয়োগারত। আমি থমকে দাঁড়ালাম। সাদা সালোয়ার, টপ’টাও সাদা। স্বর্ণকেশী। আমাদের ভারতীয় নয় সে। সকালের বাতাসে তার কানের কাছের চুল দোল খাচ্ছে। আমি কোনোভাবে তাকে বিরক্ত করলাম না। সরে এসে সিঁড়ির মুখে দাঁড়ালাম। পূর্ব আকাশে লালচে আভা।

ঊর্ধভী (মেয়েটির নাম) নিচ থেকে আমাকে ডেকে বলল, আমার কাজ শেষ। নিচে নেমে এসো।

তার এক মিনিট পরেই আমরা রক বিচের পথে। হোয়াইট টাউন ডানে রেখে একটা মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। মনাকুলা বিনায়গর (গণেশ) মন্দির। দুইজনে মন্দিরে প্রবেশ করলাম। তার আগে জুতো জোড়া আমাদের জমা রাখতে হলো বাক্সে।

সকালের বাতাস, ধূপধুনি, মন্দিরের আরতি স্নিগ্ধ আবহ তৈরি করেছে। সাথে সাথে ভক্তিগীতি শুনতে পেলাম আমি।

সে ভেতরে চলে গেল। পুরোহিতের কাছে। প্রণাম করল। তার কিছুক্ষণ পরে ফিরে আসল। হাতে কাগজ মোড়ানো কিছু একটা। আমার হাতে ঢেলে দিতে দিতে বলল, ভস্ম আর কুমকুম।

সকালের সমুদ্রের বাতাস আমার প্রাণ জুড়িয়ে দিল। বড় বড়, শক্তিশালী ঢেউ আছড়ে পড়ছে কালো পাথরে। জায়গাটার নাম রক বিচ। সূর্য কিছুটা ওপরে উঠে এলো। কিন্তু তেজ খুব বাড়েনি। ঊর্ধভী, সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে গেল। এক পায়ের উপর আরেক পা। দুই হাত জোড় করে মাথার উপরে তুলে ধরা। সূর্য প্রণাম। Sun Salutation। সমুদ্রের বাতাসে তার চুল উড়ছে। আমি রক বিচে একটা পাথরের উপর বসে আছি। পেছনে উদীয়মান সূর্য। সামনে প্রণামরত ঊর্ধভী।

সন্ধ্যার পর আমি রুমেই ছিলাম। সে ফিরে আসল রাত সাড়ে নয়টার দিকে। খুব উৎসুক। গালভর্তি হাসি। মায়ের স্তন পান করা শিশুর মতো সারল্য তার গালে, চোখে। মাথার চুলগুলো বাইরে থেকে সাজিয়ে এনেছে। তাতে বেলি ফুল ও ছোট ছোট গোলাপ। আমাকে বলল, দেখবে একটা জিনিস!

আমার হাতে তুলে দিল একটা ছোট কাপড়ের পুঁটলি। নরম, নীল রঙের নরম কাপড়ের পুঁটলি থেকে বের হয়ে আসলো লম্বা আয়তাকার একটা কবচ। আমাকে বলল, এটা রুপো।

আমি রুপোর কৌটো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তার টোল পড়া গালে ভরাট হাসির দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

আরো দুইদিন চলে গেল। হোস্টেলে আমি আর ঊর্ধভী। নতুন কোনো গেস্ট এলো না। আমি লবিতে বসে একটা ইয়োগার বইতে চোখ বোলাচ্ছিলাম। সে আমাকে ইনস্টাতে মেসেজ দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কোথায় আছি।

বললাম, আমি অরোভিল গিয়েছিলাম। মাত্রই ফিরেছি। লবিতে বসে রেস্ট নিচ্ছি। কিছুক্ষণ পরে সে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সারাদিন কী করেছ? কেমন গেল আজকের দিন?

উত্তরে কিছু না বলে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমার জ্বর হয়েছে। দেখ শরীর গরম। আমি আজ কোথাও যাইনি। সারাদিন কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমিয়েছি।

সময় বয়ে যাচ্ছে। সাগরপাড়ে এই প্রাচীন শহরে আমি অতিথি মাত্র। ঊর্ধভী আমাকে তার সাথে রামেশ্বরাম যেতে বলল। সে খুবই এক্সাইটেড। তার ঋষিকেশ থেকে এখানে আসার কারণ রামেশ্বরাম দেখা। কিন্তু আমার বাকেট লিস্টে রামেশ্বরাম নেই। আছে কন্যাকুমারী।

ভারত মহাসাগরের পবিত্র বাতাস, ঊর্ধভীর মায়া, পন্ডিচেরির প্রশান্তি আমাকে দোটানায় ফেলে দিল। আমাকে অনেক দূর পাড়ি দিতে হবে।

কন্যাকুমারী, বারকালা, তিরুবনন্তপুরম, ফোর্ট কোচি, আলেপ্পি, মুন্নার, উটি, ব্যাঙ্গালোর, পুনে হয়ে মুম্বাই। দিল্লি থেকে ঢাকার টিকিট কাটা আছে আবার।

সেদিন বিকেলে সাগরের ঝাপটা বাতাস আছড়ে পড়ছে পন্ডিচেরির উপকূলে। আমি পিঠে একটা বড় ব্যাগ, বুকে আরেকটা ব্যাগ নিয়ে হোয়াইট টাউন পার হচ্ছি। আমার বাম পাশে একটা পুরনো ভবনের উপরে সাদা ও নীল ডোরাকাটা ফ্রান্সের পতাকা উড়ছে পতপত করে তখনো।

← Back to Travel Stories

Related stories

Pai · Khong River · Culture & Community

সাম্বালা, ইউটোপিউয়ান জগৎ।

খং নদীর পাড়ে তাঁবু, গান আর নানা দেশ থেকে আসা মানুষ। সাম্বালার দিনগুলোতে প্রকৃতি ও একসঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে এই ভ্রমণলেখা।

Published 6 November 2026 · 6 min read
Read story ↗
Terraced green rice fields beneath the mountains of Sa Pa
Sa Pa · Mountains & Trails

সাপা, উওর ভিয়েতনাম

মেঘে ঢাকা সাপায় পৌঁছানো থেকে ক্যাট ক্যাট গ্রাম ও পাহাড়ের আড়ালে ট্রেকিং। সবুজ ধানখেত, বৃষ্টি আর চাঁদের আলোয় অন্য রকম এক শহর।

Published 6 November 2026 · 6 min read
Read story ↗