← Travel StoriesSa Pa, Vietnam · Mountains & Trails

সাপা, উওর ভিয়েতনাম

মেঘে ঢাকা সাপায় পৌঁছানো থেকে ক্যাট ক্যাট গ্রাম ও পাহাড়ের আড়ালে ট্রেকিং। সবুজ ধানখেত, বৃষ্টি আর চাঁদের আলোয় অন্য রকম এক শহর।

Terraced green rice fields beneath the mountains of Sa Pa
Sa Pa · Photograph by the author, previously published in Ajker Patrika.

সাপা উওর ভিয়েতনামের একটি পাহাড়ি শহর। চীন সীমান্তের কাছে লাও চাই প্রদেশে তার অবস্থান। ভিয়েতনামের রাজধানী হো চি মিন থেকে সাড়ে তিনশো কিলোমিটার দূরত্ব। সন্ধ্যা রাতে বাসে উঠলে সকালে পৌঁছে যাওয়া যায়। এখান থেকে চীন সীমান্ত মাত্র ত্রিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সাপা শহর থেকে উত্তরে তাকালে যে পাহাড়শ্রেণি দেখা যায়, তার পরে চীন।

একদিন সন্ধ্যাবেলায় আমি সাপার বাসে উঠে পড়লাম। তখন ছিল মে মাস। চমৎকার এসি বাস। উঠেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়লাম। শেষ রাতে ঘুম ভাঙ্গলো বাসের ঝাকুনিতে।

জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি বাহিরে মেঘে ঢাকা শহর, পাইনের মাথা দেখা যাচ্ছে। তখনো আলো ফোঁটেনি। বাস থেকে নেমে অনেক টুকু পথ হেঁটে আমি আমার হোস্টেলে পৌঁছে গেলাম। পথে মেঘ কেটে কেটে রাস্তা খুঁজে এসেছি।

আমার হোস্টেলের নাম গ্রিন সাপা হোস্টেল। পাহাড়ের ঢালে চীন মুখী কাঠের দোতলা বাড়ি। নিচ তলায় রেস্টুরেন্ট আর উপরে থাকার ঘর। সবই কাঠ দিয়ে বানানো। মেঝে, ছাউনি, সিড়ি, পিলার। মোটামোটা গাছের লগ। এই অঞ্চলে অনেক কাঠ সহজলভ্য বোঝাই যাচ্ছে। লম্বা টানা বারান্দা থেকে হ্যাম রং (Ham Rong Mountain) পাহাড়শ্রেণি পর্যন্ত দেখা যায়। সবুজ পাহাড়ের উপর মেঘের উড়াউড়ি। কিছুক্ষণ বাদেই নামে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। আমি একটা মোটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে মেঘ, পাহাড়, বৃষ্টি আর পাইনের খেলা দেখছি। সবুজ রংটা চোখে আরামের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। পাহাড়ের ঢালে দিগন্ত বিস্তৃত লুকানো জনপদ। পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত ধাপযুক্ত ধানক্ষেত। আর পাহাড়ের আড়ালে তাদের আবাস। আকারে খর্বাকৃতির (অনেকটা লাওসের মানুষের মত), পরিস্কার উজ্জ্বল ত্বক, মাথায় হালকা সোনালী চুল। নারীদের কোমরে এক টুকরা রঙ্গিন কাপড় দিয়ে জড়ানো থাকে। প্রায় সব নারীরই একটা দাঁত সোনা দিয়ে বাধানো।

দুই-তিন দিন হয়ে গেল। আমি বারান্দায় দাড়িয়ে বিরস চা পান (ঠিক আমাদের মত চা নয়) করি, মেঘ দেখি। আমার জমে থাকা গ্লানি সাদা পাতলা মেঘের সাথে উবে যাচ্ছে। বাড়িটিতে দুইটা বিড়াল, একটা কুকুর, আর ফুটফুটে একটা ভিয়েতনামি বাচ্চা আছে। আমি হ্যামকে শুয়ে শুয়ে দোল খাই। বাচ্চা আর কুকুরের খুনসুঁটি দেখি।

একদিন দুপুর বেলা এক ভিয়েতনামি ছেলের সাথে ক্যাট ক্যাট ভিলেজ দেখতে গেলাম। প্রথেমে স্কুটার, তারপর কয়েকশত সিড়ি বেয়ে এক রূপকথার গ্রামে এসে আমি হাজির হলাম। একটা কাঠের ব্রীজের উপর দাড়িয়ে দেখলাম সামনে দানবের মত একটা ঝর্ণা গর্জন করে জলপাত করছে। নিচে পাহাড়ি নদী বয়ে যাচ্ছে। দুই পাশে পাহাড়ের চূড়া, তার উপরে মেঘ। তার উপরে আর কিছু দেখা পেলাম না।

পাহাড়ের পাথুরে গায়ে অর্কিড ঝুলছে। যেন কোন শ্যামলা নারী ঝুমকা পরে সেজে আছে।

একটা প্রাচীন টারবাইন ঘুরছে নদীর উপরে। পাশ দিয়ে কাঠের লম্বা রাস্তা। যায়গাটা আদ্র ও শীতল। আমি হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি। আর অনুভব করছি, কয়েক শত বছর আগে ফ্রেন্স উপনিবেশকগন পাহাড়ের আড়ালে এই গ্রামটা আবিষ্কার করেন। তাদের ভীষণ পছন্দ হয় গ্রামটি। এখানে তারা রাস্তা, ব্রীজ, টারবাইন তৈরী করে নিজের বসবাসের জন্য। বহু বছর হলো, ফরাসিরা চলে গেছেন ভিয়েতনাম ছেড়ে। কিন্তু ভিয়েতনামের সংস্কৃতি, ভাষা, জীবন যাত্রায় বড় প্রভাব রেখে গেছেন।

গ্রামটি পরাবাস্তব লাগছে আমার কাছে। বৃষ্টি শুরু হল। আমি সহ অন্যরা পাহাড়ের সাথে লাগোয়া কিছু কুঠিরে আশ্রয় নিলাম। বেশ কয়েক নারী সেখানে কাজ করছেন। বুননের কাজ। কেউ রান্না করছেন। তাদের জামা-কাপড় খুব ব্যাতিক্রম। গহনাগুলো আগে আমি দেখিনি এমন। এক বাড়িতে আমাকে চা বাড়িয়ে দিলেন। চা পাতার চা নয়। শুকনো ফুলের পাপড়ি, শিকড় গরম পানিতে ভিজিয়ে দিয়েছে। বড় বড় মাংসের টুকরা (মহিষের মাংস) মশলা মাখিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছেন। সেখান থেকে কেঁটে আমার হাতে এক টুকরা ধরিয়ে দিলেন। আমি কিছুক্ষণ চিবিয়ে গিলে নিলাম।

আমার ভিয়েতানামি বন্ধুটি ইংরেজি জানে না। আমি ভিয়েতনামি জানি না। পাহাড়ের আড়ালে মোবাইল নেটওয়ার্ক আসে যায়, আসে যায়। প্রযুক্তি ব্যবহারের আড়ম্বর আর করা গেল না। কথা না বলা যাক, তারপরেও আমরা বন্ধু। আমি স্কুটির পিছনে বসে থাকি। সে চালায়। কোথাও চমৎকার জায়গার দেখা পেলেই দাড়িয়ে যাই।

তার দুই দিন পরে এক মং দম্পতির সাথে পাহাড়ের আড়ালে ট্রেকিং-এ যায়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হলাম। তারা আমাকে তাদের গ্রামে নিয়ে যাবে। সাপার বিখ্যাত ধাপযুক্ত ধানক্ষেত দেখাবে। এই জন্য তাদেরকে আমি দুই হাজার টাকার মত দিবো। শহর পেরিয়ে আমরা ধীরে ধীরে পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছি। কখনো পাহাড়ি নদী পার হচ্ছি, কখনো বন। ভীষণ পিচ্ছিল। মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে। একবার এক গাঁজা ক্ষেতের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তার উৎকট গন্ধ নাকে এসে লাগলো।

অনেকক্ষণ থেকে আমি একাই হাঁটছিলাম। সাথে আমার গাইড। তাকে আমি জিজ্ঞেস করালাম, “কি ব্যাপার আমি একা কেন?” সে জানালো, “আজকে আর কোনো টুরিস্ট রাজি হয় নাই তার সাথে ট্রেক করার জন্য।” বলে একটা হাসি দিল। ছোট একটা কিশোর ছেলের মতো।

আমার বয়সি হবে। অথচ আমাকে স্যার স্যার বলে যাচ্ছে। একবার আমকে জিজ্ঞেস করল, আমার ন্যাশনালিটি। আমি বাংলাদেশ বললাম। এর আগে নাম শুনেনি। আমি মোবাইল ফোন বের করে ম্যাপ থেকে আমাদের দেশ দেখালাম। বললাম, “তুমি যদি সোজা এখান থেকে পশ্চিম দিকে হেটে যেতে থাকো তাহলে এক সময় তুমি আমার দেশে পৌছে যাবে।” আমার দেশের টাকা দেখতে চাইল। আমি পাসপোর্ট আর গোলাপী দশ টাকার নোটটা বের করে দেখালাম।

সুন্দরের পরেও সুন্দর। সবুজের পরে সবুজ। পাহাড়ি নদীর পাড়ে এসে আমি এক ভ্যালিতে থমকে দাড়ালাম। খাঁজ কাটা পাহাড়ের ধাপে ধাপে সবুজ ধান খেত। সরু আইল। অপূর্ব। এভাবে মিশে গেছে Ham Rong পাহাড়শ্রেণির পেরেয়ে চীন সীমান্ত পর্যন্ত।

পথে এক পাহাড়ি বাজার থেকে আলু বোখারা আর কলা কিনে নিলাম। আলু বোখারাগুলো ভীষণ মিষ্টি। তার আগে আমি কখনোই কাচা আলু বোখারা খাইনি। হেঁটে হেঁটে বিকেল কাছে এসে দাড়াল আমার। পাহাড়ের চূড়ার উপরে সূর্যের আলো হলুদ হয়ে দ্যুতি ছড়াচ্ছে। সবুজ ধানক্ষেত গুলোর উপরে হলুদ আলোয় ভরে গেল উপত্যকা। আমার পা ব্যাথা করছে (প্রায় চৌদ্দ কিলোমিটার ট্রেক করেছিলাম আমি) কিন্তু প্রাণ তখনো চঞ্চল। সবুজের মাদকাতায় বিভোর।

সাপার মত এত আধুনিক শহরে আমি আর যাইনি। সাপার স্টেশনটা যেন The Hotel Grand Budapest এর মত। শহরের মাঝখানে মুক্ত অডিটোরিয়াম। সন্ধ্যায় এখনে ফ্রি স্টাইলে নাচ, গান হয়। সবাই খাবার খায়, পান করে। আর উপভোগ করে। শহরে একপাশে আরেকটা লেক। চারপাশের জগিং ট্র‍্যাক। টেনিস খেলার কোট।

আমি ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে সাপাকে অবগাহন করি। মেঘ, বৃষ্টি, রোদ, পাইনের মাথা এবং চীন সীমান্ত আমাকে খুব কৌতূহল নিয়ে কাছে ডাকে। আমি নিঝুম রাতে সাপার পাহাড়ি রাস্তা ধরে হেটে যাই। পাহাড়ের কার্নিশে দাড়িয়ে চীন সীমান্তের দিকে তাকিয়ে থাকি। চীন যেন আমার কাছে রহস্যময় এক দেশ।

আজ মেঘ কেটে চাঁদ উঠেছে। বৃষ্টি জলে ধোয়া চাঁদ। বড় পবিত্র। বিশাল থালার মত ভেসে বেড়াচ্ছে সাপার আকাশে।

চাঁদের মুখে মাঝে মাঝে মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছে। আবার সরে যাচ্ছে। আমি তার নাটকীয়তার গৌণ সাক্ষী।

চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে সাপা উপত্যকা। বৃষ্টি যে শহরকে ধুয়ে দিয়ে গেল, চাদের আলো সেই শহরটাকে আরো রহস্যময় করে তুলেছে। বড় শান্ত শহরটা এখন। আমার চোখে পড়ছে গির্জার ক্রুসের মাথা, পাইন গাছের আবছা ছায়া, Ham Rong পাহাড়শ্রেণি। সমুদ্রে যেভাবে পানি ঢেউ খেলে, সাপা উপত্যকায় চাদের আলো সেভাবে ঢেউ খেলছে। ঢেউ ভাঙছে, হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের আড়ালে।

আমি কাঠের লম্বা বারান্দায় দাড়ানো। আমার চোখ শীতল হয়ে যাচ্ছে। আমার মনের রুক্ষ জমিটা বৃষ্টির জলের ফোঁটা পেয়ে যেন আরও শীতল হয়ে উঠছে। আমার ক্লান্তি। অতীত গ্লানি উবে যাচ্ছে।

← Back to Travel Stories

Related stories

A traveler practicing yoga on the rocks beside the sea in Pondicherry
Pondicherry · People & Place

ঊর্ধভী, পন্ডিচেরি উপকূল

পন্ডিচেরির এক ভোরে ঊর্ধভীর সঙ্গে সমুদ্রের পথে হাঁটা। পুরোনো ফরাসি শহর, উপকূলের বাতাস আর কিছু পরিচিত হয়ে ওঠার মুহূর্ত।

Published 6 November 2026 · 4 min read
Read story ↗
Pai · Khong River · Culture & Community

সাম্বালা, ইউটোপিউয়ান জগৎ।

খং নদীর পাড়ে তাঁবু, গান আর নানা দেশ থেকে আসা মানুষ। সাম্বালার দিনগুলোতে প্রকৃতি ও একসঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে এই ভ্রমণলেখা।

Published 6 November 2026 · 6 min read
Read story ↗