গ্রামের শেষ বাড়ি থেকে
পৃথিবীর পথে।
গ্রামের শেষ বাড়িটি ছিল আমাদের। তার পরে ছড়ানো ছিল ফসলের মাঠ। মাথার ওপরে নীল আকাশ। বর্ষায় কানায় কানায় ভরে উঠা ধানক্ষেত। জলে কই মাছের চলাচল, ঘাসের ডগায় ঘাসফড়িংয়ের জীবন। শীতের বিকেলে ফসলহীন মাঠ ধীরে ধীরে ধূসর হয়ে যেত। সকালে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে সরিষাক্ষেতের পাশ দিয়ে স্কুলে যেতাম। বাতাসে ভেসে আসত ধনেপাতার সুবাস।
নব্বইয়ের দশকে কুমিল্লার একটি গ্রামে আমার জীবন শুরু হয়েছিল এমনই এক সাধারণ সকালের মতো। তখন জানতাম না, এই মাঠ, বর্ষা, ধানক্ষেত আর শীতের তারাভরা রাত আমাকে নিঃশব্দে গড়ে তুলছে। চারপাশের ছোট ছোট জীবনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার ভেতরে জমা হচ্ছে অসংখ্য প্রশ্ন। গ্রামের কাছে আমি পেয়েছি সারল্য, অকপটতা আর কিছুটা উদাসীনতা। পেয়েছি চারপাশের পৃথিবীকে আপন মনে দেখার অবকাশ।
পুরো গল্পটি পড়ুন
বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকা লাজুক ছেলেটি কখনো ভাবেনি, একদিন হ্যানয়, বিশাখাপত্তনম, পাই কিংবা ডাভাওয়ের রাস্তায় হেঁটে বেড়াবে। কয়েক বছর আগেও আমার কাছে এসব শহর ছিল দূরের নাম। সেখানে মানুষের সকাল হয় কেমন করে, বাজার বসে কোথায়, সন্ধ্যায় কোন রাস্তায় আলো জ্বলে—এসব নিজের চোখে দেখতে যাব, এমন কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা আমার ছিল না।
কোভিডের সময় লেখাপড়া শেষ হলো। তত দিনে আমার মনের অনেকখানি দখল করে নিয়েছেন বুদ্ধদেব গুহ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁদের লেখায় বন, পাহাড়, নদী আর দূরের জনপদ পড়তে পড়তে নিজের চেনা জীবনের বাইরেও অন্য জীবনের আভাস পেয়েছি। পাওলো কোয়েলহো, কাহলিল জিবরান ও নিকোলা বুভিয়ের সেই ভাবনাকে আরও দূরে নিয়ে গেছেন। স্টিভেন স্পিলবার্গ ও মেল গিবসনের সিনেমার পৃথিবীতেও ডুবে থেকেছি। আর সবকিছুর মধ্যে বারবার ফিরে এসেছে জীবনানন্দ দাশের কবিতা। জীবনকে তাঁর মতো করে এক বিপন্ন বিস্ময় মনে হয়েছে আমারও।
চাকরি শুরু করেছিলাম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পোর্টফোলিও ম্যানেজার হিসেবে। স্প্রেডশিট, লাভ-ক্ষতির হিসাব আর প্রতিদিনের দায়িত্বে একটি নিয়মিত জীবন তৈরি হচ্ছিল। সেই কাজের মধ্যেও মন চলে যেত অপরিচিত শহরের অলিগলিতে। কোনো অচেনা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে কোথায় পৌঁছাব, আগে থেকে সব না জেনেও একটা দিন কাটানো যায় কি না—এসব ভাবনা আমাকে ভেতর থেকে আকুল করত।
কিন্তু ইচ্ছা হলেই বেরিয়ে পড়া যায় না। বাংলাদেশি সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণের প্রস্তুতিতে অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়। কোথায় যাওয়া সম্ভব, কীভাবে যাওয়া যায়, কত টাকা প্রয়োজন, কোথায় থাকব—আমি বারবার এসব নিয়ে খোঁজ করেছি। একটু একটু করে তথ্য জোগাড় করেছি, হিসাব মিলিয়েছি, পথ খুঁজেছি।
২০২৩ সালে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় দেড় মাসের একটি ব্যাকপ্যাকিং ভ্রমণে বের হই। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে থাকি। সেই ভ্রমণে আমার সঙ্গে পরিচয় হয় কয়েক শ মানুষের। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আসা মানুষ; রাশিয়া, জাপান, চীন কিংবা নিউজিল্যান্ডের ভ্রমণকারী। এত দেশের মানুষের সঙ্গে এর আগে কখনো একসঙ্গে মেশার সুযোগ হয়নি আমার।
হোস্টেলে আমরা একই ঘরে থাকতাম। একসঙ্গে বাজার করতাম, রান্না করতাম। কোনো বিকেলে কয়েকজন মিলে পাহাড়ে যেতাম সূর্যাস্ত দেখতে। রাতে হাঁটতাম ওয়াকিং স্ট্রিটের ভিড়ে। গল্প করতে করতে জানতে পারতাম, কে কোথা থেকে এসেছে, কত দিন ধরে পথে আছে, এরপর কোথায় যাবে। কারও ভ্রমণের ধরন আমার মতো, কারও একেবারেই আলাদা। তাদের কথা শুনে বুঝতে শুরু করলাম, পৃথিবী দেখার অনেক রকম উপায় আছে।
এই স্বাধীনতার স্বাদ আমাকে আরও বেশি করে ভ্রমণের দিকে টেনেছে। নিজের সময় নিজে ঠিক করা, কোনো জায়গা ভালো লাগলে আরও কয়েক দিন থেকে যাওয়া, নতুন কারও সঙ্গে পরিচয়ের পর একসঙ্গে পরের শহরে রওনা দেওয়া—এসবের মধ্যে এমন এক আনন্দ পেয়েছিলাম, যার সঙ্গে আমার আগের জীবনের পরিচয় ছিল অল্পই।
হোস্টেলের বন্ধুদের কাছেই আমার অনেক শেখার শুরু। কীভাবে ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে হয়, গুগলে খুঁজে অপরিচিত শহরের প্রয়োজনীয় তথ্য বের করতে হয়, নিজের উপযোগী হোস্টেল কিংবা ভ্রমণকারীদের কোনো কমিউনিটি খুঁজে পাওয়া যায়—তারা আমাকে দেখিয়েছে। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা, নতুন ভাষার দু-চারটি শব্দ শেখা, সাহায্য চাওয়া কিংবা আলাপ শুরু করার সংকোচ কাটাতেও তাদের সঙ্গ আমাকে সাহস দিয়েছে।
ধীরে ধীরে বিভিন্ন ওয়েবসাইট, অ্যাপ্লিকেশন ও ফোরাম ব্যবহার করতে শিখলাম। পাশাপাশি একটি প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে থাকলাম: ভ্রমণ করতে করতেই কীভাবে আয় করা যায়? দীর্ঘ সময় পথে থাকতে হলে এই প্রশ্নের একটি বাস্তব উত্তর আমার প্রয়োজন ছিল।
স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হতে শুরু করলাম। কাউচসার্ফিংয়ের মতো মাধ্যম ব্যবহার করে বিভিন্ন হোস্টের বাড়িতে থাকলাম। তাঁদের ঘরে থেকে, দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট কাজে অংশ নিয়ে একটি জায়গাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো। থাইল্যান্ডে একটি তাঁবু কিনলাম। অন্য ব্যাকপ্যাকারদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্পিং শুরু করলাম। থাকার ব্যবস্থা, যাতায়াত আর প্রতিদিনের খরচ নিয়ে আমার ধারণাও বদলাতে থাকল।
চিয়াং মাইয়ে তুরস্কের এক তরুণীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। সে আমাকে হিচহাইকিং করতে শিখিয়েছিল। একদিন আমরা হিচহাইকিং করে থাইল্যান্ড থেকে লাওস সীমান্তের দিকে রওনা হই। ফেরার পথে পাহাড়ি এক জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলি। তিন-চার ঘণ্টা লেগেছিল সেখান থেকে বের হতে।
সেই কয়েক ঘণ্টার অনিশ্চয়তাও আমার ভ্রমণজীবনের অংশ। পথে আনন্দ আছে, আবার ভুল সিদ্ধান্ত, ভয় আর নিজের অপ্রস্তুত অবস্থার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতাও আছে। কখন সাহায্য চাইতে হবে, কখন থামতে হবে, কোন বিষয়ে আরও ভালো প্রস্তুতি দরকার—এসবও আমাকে শিখতে হয়েছে।
নানা দেশের ব্যাকপ্যাকার আর হোস্টেলের জীবন আমাকে এভাবেই একটু একটু করে বদলেছে। বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা যে লাজুক ছেলেটি অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে সংকোচ বোধ করত, সে নিজে থেকে আলাপ শুরু করতে শিখল। নতুন কোথাও পৌঁছে প্রথমে কী করবে বুঝতে না পারলেও ধীরে ধীরে নিজের ব্যবস্থা নিজে করতে পারল। আমার ভেতরের পরিবর্তনটা টের পেতাম এসব ছোট ঘটনায়।
ঢাকায় ফিরে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু তখন হাতে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না। ইচ্ছা থাকলেও সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়তে পারিনি। আরও কিছুদিন কাজ করতে হয়েছে, প্রস্তুতি নিতে হয়েছে, নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নেওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হয়েছে।
২০২৫ সালে চাকরি ছেড়ে আমার ব্যাকপ্যাকিং জীবন শুরু করি। বর্তমানে আমি পূর্ণসময়ের ভ্রমণকারী। ভ্রমণের পাশাপাশি আয়ের জন্য ভিডিও বানাই, বই লিখি। মাঝে মাঝে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজও করি। এই জীবন চালিয়ে নেওয়ার উপায় এখনো শিখছি। পথে থাকতে থাকতে নিজের প্রয়োজন, সামর্থ্য আর কাজের ধরন সম্পর্কে নতুন করে বুঝতে হচ্ছে।
ইতিমধ্যে এশিয়ার এক শ শহর ঘুরে এবার আফ্রিকার দিকে পা বাড়াচ্ছি। সামনে কোনো একদিন দক্ষিণ আমেরিকা ও চীন দেখার ইচ্ছা আছে। প্যান-আমেরিকান হাইওয়ে ধরে দীর্ঘ পথ পেরোনোর স্বপ্নও দেখি। গ্রামের শেষ বাড়িটি থেকে শুরু হওয়া জীবনে এখন অনেক দূরের জায়গার নাম জড়িয়ে গেছে। তবু নতুন কোনো খোলা মাঠের সামনে দাঁড়ালে শৈশবের সেই আকাশের কথা মনে পড়ে।
গ্রামের সরিষাক্ষেতের পাশ দিয়ে স্কুলে যাওয়া ছেলেটি জানত না, একদিন এত দূরে এসে পৌঁছাবে। এখনো কোনো নতুন শহরে পৌঁছালে আমার অনেক কিছুই অজানা থাকে। ব্যাগটা নামিয়ে রাখি, চারপাশ দেখি, তারপর একটু একটু করে চিনতে শুরু করি।














