সাম্বালা, ইউটোপিউয়ান জগৎ।
খং নদীর পাড়ে তাঁবু, গান আর নানা দেশ থেকে আসা মানুষ। সাম্বালার দিনগুলোতে প্রকৃতি ও একসঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে এই ভ্রমণলেখা।
খং নদীর পাড়ে বসে আছি আমি।
ফেব্রুয়ারির বিকাল। শীতের তিব্রতা নাই এখন আর। পাতা ঝরে পড়ছে অবিরাম। পুর্ণমোচি পাতা ঝরা গাছ বেশি এখানে। সবচেয়ে অবাক লাগছে এখানেও কোকিল ডাকছে। আমি ভেবেছিলাম কোকিল শুধু বাংলাদেশে ডাকে। এই বিদেশে কোকিলের ডাক আমাকে বাংলাদেশের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে বারবার। পুরো শীতকালটা এখানে কেটেছে আমার।
নদীতে পানি গড়িয়ে যাচ্ছে। পাথরে ফাঁকে ফাঁকে তিরতির করে। নদীতে সাধারণত স্রোত থাকে। খং নদীতে স্রোত নেই। শীতে শুকিয়ে গেছে। নদীর তলদেশে কাদা নয়। রয়েছে মসৃণ সব পাথর। গোসল করতে নামলে পায়ে কাদা লাগে না। মাঝে মাঝে আছে জ্যাকুজি। ছোট খাদ। পুলের মত। সেখান কোমড় সমান পানি। কিছুক্ষণ আগে আমি গোসল করে এলাম। ভেজা চুলে বসে আছি আমি।
বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। খুব ধীরে ধীরে। আমার দৃষ্টিসীমার মধ্যে মে হং সন পাহাড় শ্রেণী। নীল আকাশ, সবুজ পাহাড়। বিকালের সোনালী আলো অদ্ভুত। অবাস্তব প্রতিবিম্ব তৈরী করেছে এখানে। প্রথমে গাঢ় সবুজ বন, উপরে পাহাড়, তার পরে বিকালের সূর্যের সোনালী আভা, তারপরে আবার নীল আকাশ। প্রত্যেকটা শেড আলাদা আলাদা আস্তরণ তৈরী করেছে। কোথায় যেন পাহাড়ে জুমে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে কেউ। হালকা ধোঁয়া মিশে যাচ্ছে বিকালের ক্যানভাসে। পাহাড়ের ভাজে কোনো ছোট কমিউনিটিতে গান হচ্ছে। সেখান থেকে ড্রাম বাজার মতো শব্দ আসছে। যদিও খুব ক্ষীণ।
আমি বসে আছি তাবুর পাশে। আজ রাতে এখানে আমার থাকার ব্যবস্থা। আমার ভেজা চুল থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে কাঁধে। সূর্যের সোনালী আলো উপাত্যকাটিকে আরো মোহনীয় করে তুলছে। আমি তাকিয়ে আছি পাহাড়, আকাশ যেখানে মিশেছে। আকাশ, পাহাড়, বনের আস্তরণ গুলো এত মোহনীয়। পরাবাস্তব লাগছে। মনে হচ্ছে দূরের অচেনা গ্রহে অপরিচিত বনের পাশে এখন বসে আছি আমি।
আমার সাথে একটা চীনা ছেলে আছে। তার নাম এ্যাভোন। বেইজিং থেকে পাইতে এসেছে। এ্যাভনের সাথে আমার পরিচয় টেম্পেলে। ছেলেটা আমার অনেক ছোট। সুন্দর, ফর্সা, লম্বা লম্বা চুল। মায়ের সাথে বেইজিং এ থাকে। সেখান থেকে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া হয়ে পাইতে এসেছে। চীনা নব বর্ষ দরজার কড়া নাড়ছে। চীনারা খুব খুশি এই নিয়ে। তাদের সাথে কথা বললে তার আঁচ পাওয়া যায়।
অব্যক্ত অনেক কথা আছে। অশ্রুত অনেক শব্দ আছে। ভাষার সীমাবদ্ধতা আছে। আমার সীমাবদ্ধতা আরো বেশি। মাত্র কয়েক হাজার শব্দ দিয়ে আমার অনুভূতির প্রকাশের উপায় অতি খোঁড়া। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে আকাশে আজ চাঁদ উঠেছে। সেই বনের ওপাড়ে। কমলা রংয়ের বড় চাঁদ। বাচ্চাদের পেইন্টিং বইয়ে যেমন চাঁদ থাকে। আজকের সন্ধ্যার চাঁদটাকে তেমন দেখাচ্ছে। বনের উপর ধীরে ধীরে উঠছে। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো খুব উজ্জ্বল নয়। তারপরেও বনের উপর তার কালো ছায়া নেমে এসেছে। আমি হেলে পড়া নারকেল গাছের আড়াল থেকে এই মহা চিত্রকর্ম দেখছি। পূর্ব আকাশে কমলা রঙের বড় চাঁদ। যার অর্ধেক এখনো ঢাকা পড়ে আছে। পাহাড়ের নিচে বনের ছায়া। নদীর ওপাড়ে শূণ্য মাঠটা খাঁ খাঁ করছে। কিছুদিন আগে এখানে ভুট্টার ক্ষেত ছিল। এখন শূণ্য।
আমার কমিউনিটির মেম্বাররা নানান দেশ থেকে এসেছেন। চীনা, জাপানিজ, মঙ্গোলিয়ান, রাশিয়ান,, ককেশীয়। তাদের মধ্যে কয়েকজন ফরাসী মেয়ে আছে। ইউরোপীয়, আমেরিকান, ক্যানাডিয়ান অথবা অস্ট্রেলিয়ান এদের মধ্যে আলাদা বৈশিষ্ট্য কি! আমি এদেরকে আলাদা করতে পারি না। এইদিকে আবার জুরা বেশি থাকে। তারাও আছে। একমাত্র আমি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করছি। দেশের পরিচয় এখানে গৌণ। বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও কল্যান এখানে সর্বাজ্ঞে। এখানে কেউ একা খাবার খায় না, কেউ একা রান্না করে না। কেউ একা একা ঘুরতে যায় না। এটাই কমিউনিটির নিয়ম। খাবার রান্না করলে সবার জন্য করতে হবে।
সকালে ঘুম ভাঙ্গে ভিনদেশী গানের সুরে। আমি তার কিছুই বুঝি না। কিন্তু সুরের শ্বাশত মূর্ছনা আমার সকাল’কে পবিত্র করে তোলে। তার মধ্যে স্প্যানিশ গানের আধিক্য বেশি ছিল। স্প্যানিশ গানে সব সময় আনন্দের রেশ বেশি থাকে।
স্লোভাকিয়ান ছেলে মাইকেল। লম্বায় অন্তত সাড়ে ছয় ফুট হবে। নদীর বড় পাথরের উপরে বসে মেডিটেশন করছে।
নদীর পাড়ে নারকেল গাছের নিচে মুঙোলিয়ান মেয়ে সাচির তাবু। পাশে সাচার। চীনা ধনকুবের জিং জিং ও তার ফ্যামিলি থাকে আমার পিছনে বেশ দূরে। একটা গাছের নিচে তাদের তাবু। জিং জিং এর স্ত্রী কাই। আমার বিশেষ বন্ধু। আমরা অনেক ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছি এত দিনে। কাই আমাকে এখানে সেখানে নিয়ে যায় স্কুটি’তে করে। গত সপ্তাহে তার বোন, বোনের জামাইয়ের সাথে আমরা একদিন কাটিয়ে আসলাম। ফেরার পথে বেশ ঠান্ডা লাগে। স্কুটি চলছে পাইয়ের উচু নিচু সর্পিল রাস্তা ধরে। দুপাশে গাছের ছায়া। মাঝে মাঝে কফিশপ, পাব থেকে আলো এসে আমাদের গায়ে এসে লাগে। স্কুটি চালাচ্ছে কাই, আমি পিছনে বসে আছি। বেশ ঠান্ডা। আমার ফুলওভার আনা হয়নি, যখন আমরা বের হয়েছি। তখন চওড়া রৌদ্র ছিল। কাইয়ের শীতের কাপড় স্কুটির সীটের নিচেই থাকে।
আমার হাত কাধ থেকে নামিয়ে কোমড়ে সরিয়ে আনলো সে।
বলল, I don’t want you fall down, hold me tight.
একটা চীনা মেয়ের সরু কোমড় জড়িয়ে বসে আছি স্কুটিতে। দুপাশে আমাদেরকে বাতাস কেটে কেটে যাচ্ছে। তার খুব মোলায়েম পুরু জ্যাকেট আমাদের মাঝে কুশন হিসেবে বাধা তৈরি করছে। আমার বুকে বেশ আরাম লাগছে। তার হালকা সোনালী চুল গুলো আমার চোখে, মুখে সুরসুরি দিচ্ছে অনবরত।
নদীর পাড়ে, উপরে সিম্বা ও নাম না জানা এক নারীর তাবু। ওদের দুইজনের একটা মিউজিক ব্যান্ড আছে। চীন, মঙ্গোলিয়ান পথে পথে ওরা গান বাজায়। পাইতে এসেছে ওরা সবচেয়ে বড় হিপি মিউজিক ফেস্টে। সাম্বালা।
গত শত বছর ধরে থাইল্যান্ডে সাম্বালা আয়োজন হয়ে আসছে। জাপানি হার্ডকোর হিপি’রা এর পাইনিয়ার। কিন্তু সারা পৃথিবীতে সাম্বালার ফলোয়ার আছে। ফেব্রুয়ারিতে তারা এখানে এসে ভীড় করে। দশ দিন ধরে চলে উৎসব। প্রায় এক বছর ধরে চলে রেজিস্ট্রেশন। কেবল গান নয়। এই এক অধরা জীবন। অবাধ স্বাধীনতা, বন্ধুত্ব, প্রেম, প্রণয়, সঙ্গীত সবাইকে মোহিত করে রাখে। দশ দিন ধরে সবাই তাবুতে থাকে। আহার এখানে। গোসলের জন্য পাহাড়ি নদী। কেউ কেউ পৃথিবির আদি রূপে ফিরে যায়।
To your heart। সাম্বালার মূল মন্ত্র। এটি ইউটোপিউয়ান জগৎ। আপনার ফ্যান্টাসি যা কিছু কল্পনা করতে পারে, সাম্বালা তার থেকে বেশি কিছু।
দুই দিন আগে ফরাসী ছেলে মেতিও সাথে আমি একটা ঝর্ণা দেখে এলাম। আসা-যাওয়া মিলে ছয় ঘন্টার ট্রেকিং। ঝিরি, নদী, পাহাড় টপকে গেলাম আমরা। ঠিক যেন আমি আলিকদমের বুনো ঝর্না ধরে হেঁটে যাচ্ছি। আমাদের সাথে ছিল ইন্দোনেশিয়াম এক মেয়ে ও তার পোশা কুকুর লওরা।
মেতিও ঝর্ণায় গোসল করল। আমি ফরাসী একটি পরিবারের সাথে খাবার খাচ্ছি। টোস্ট, এ্যাভোকাডো, বাটার, ক্যানড ফিশ। মেতিও গোসল করে এসে আমাসের সাথে যোগ দিল। একটি মেয়ে রং তুলি নিয়ে ঝর্ণার ছবি আকছে। পাশে তার প্রেমিক বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে। তারই মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে।
আমি আর পোশা কুকুর লওড়া পাশাপাশি বসে আছি। ওর লোমশ হাত পা ভেজা। ঝর্ণার ধারে অন্তর্বাস খুলছে এক স্প্যানিশ তরুনী। তার ভেজা সোনালী চুল। খয়েরি স্পটেড তুষার রঙের পিঠ। উচু নিতম্ব। নাভীর নিচে কিছু আদিম চুল। তারই ছবি তুলে দিচ্ছে আরেক তরুণী।
বিকালে ফেরার পথে একটা ধূসর রঙের শূণ্য মাঠ। মাঠের পিছনে পাহাড়। তার নিচে বনের শ্রেণী। পাহাড়ের ঢালে গাছের ফাঁকে মহামতি বুদ্ধের শুভ্র মস্তক চোখে পড়ল। বিকালের সূর্যের আলো এসে তা বড় রহস্যময় করে তুলেছে। যেন আমি বুদ্ধের তৃতীয় নয়ন দেখছি। সাত রঙ্গা আলোর বলয় তার মাথার চারপাশে। জ্যোতির্ময় বুদ্ধ।
আমি আর মেতিও স্কুটি থেকে নেমে তার ছবি নিলাম মেতিও কয়েকবার উচ্চারণ করল, বিউটিফুল, বিউটিফুল।
← Back to Travel Stories
