← Travel StoriesBandarban · Tain River, Bangladesh · People & Place

পলিন এবং তৈন নদী

পাহাড়ি পথের ক্লান্তি শেষে তৈন নদীর ধারে আটকে পড়া। নৌকার অপেক্ষায় কাটানো দিনগুলোতে পলিন, তাঁর পরিবার ও এক জনপদকে কাছে থেকে জানার গল্প।

পলিন বলল, আজ আপনারা যেতে পারবেন না। বিকাল তিনটার পরে নৌকা যায় না। আর নদীতে পানি কম। আপনাকে আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগবে। যদি আজ রাতে বৃষ্টি হয় কাল নদীতে পানি হবে। আপনারা নৌকা দিয়ে যেতে পারবেন।

আমার গলা শুকিয়ে আসছে। আমি ঢোক গিলে বললাম, আমি তাহলে থাকব কোথায়? আমি খুব ক্লান্ত আর অসুস্থ।

উত্তরে মেয়েটি খুব ধীরে চোখ নামিয়ে বলল, আমি জানি না।

আমি পলিনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। ভরাট চাঁদের মতো মুখ। নিখুঁত। ছোট ছোট চোখ। ছোট চুল। খুব পরিষ্কার আর উজ্জ্বল গায়ের রং।

মেয়েটি পরে আছে সবুজ রঙের টি-শার্ট আর খয়েরি থামিন। পায়ে স্যান্ডেল নেই। তার সাদা উজ্জ্বল পায়ে ধূলি লেগে আছে। থামিনের শেষ প্রান্ত হাঁটুর খানিকটা নিচে নেমেছে। উন্মুক্ত উজ্জ্বল সাদা পায়ে বালি লেগে আছে। আমার চোখ গেল সেদিকে।

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে আমরা হাঁটা শুরু করেছিলাম। এখন বিকাল তিনটা বাজে। প্রায় আট ঘণ্টা পাহাড় পেরিয়ে এসেছি আমরা। দানবের মতো সব পাহাড়। ধীরে ধীরে ওঠা লাগে। তার বুকের পাশ ধরে হেঁটে হেঁটে পার হয়েছি। কখনো কার্নিশ পার হয়েছি অতি সতর্কতার সাথে। খাড়া পাহাড় থেকে নামতে গিয়ে আমার বারবার হাঁটু কেঁপে উঠেছে।

নদীটার নাম তৈন। পাহাড়ের তলদেশে সাপের মতো এঁকেবেঁকে গেছে নদীটা। শুনেছি নদীটার উৎপত্তি মিয়ানমারের কাছে, বড় মোদকে। একবার দুইবার নয়, প্রায় কুড়ি-বাইশ বার পার হয়েছি নদীটা। কখনো হাঁটু পানি, কখনো শুকনো। একবার এপাড়ে, আবার ওপাড়ে। পাশ থেকে ঝরনা নেমে এসেছে নদীতে। মাঝে মাঝে ছোট খুম, আদিবাসী পাড়া, নদীর বাঁক।

পলিনের মাকে আমি চিনি। পরিচয় যদিও গত সপ্তাহে। আমার ট্রেক লিডার বলে দিয়েছিল দুসরি বাজার পর্যন্ত যেতে পারলে আমাদের আর ভয় নেই। সেখানে মিতা দিদি আমাদেরকে যেকানো ভাবে সাহায্য করবেন। আমি, আমার বন্ধু ও অন্য একজন ট্রেকমেট সেই ভরসাতে এখানে এসেছি। জীবন হাতে নিয়ে এসেছি আমরা। ত্রিশ কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তা চড়াই-উতরাই করে। পাহাড়, নদী, কার্নিশ ও খুম পেরিয়েছি। সাথে বড় বড় পাথরের বোল্ডার। আমাদের লক্ষ্য ছিল আজকের দিনের মধ্যে নৌকা দিয়ে আলীকদম বাজারে ফেরত যাব।

আমার সাথের বন্ধুটির মেজাজ অত্যধিক খারাপ। তার মাথা ব্যথা করছে। সে চেইন স্মোকার। দুই দিন আগে তার সিগারেট শেষ হয়েছে। গহীন এই পার্বত্য অঞ্চলে সিগারেট নেই। তামাক পাতা খুঁজলেও পাওয়া যেতে পারে। তার সাথে আমি গত ত্রিশ ঘণ্টার বেশি সময় কথা বলতে পারি নি। তার চেহারা বিমর্ষ, কালো, মেজাজ খিটখিটে।

অন্যজন পাহাড়ে এসে ভয় পেয়ে গেছে। তার শ্বাস ভারি হয়ে আসছে। তার মনোবল ভেঙে গেছে। বারবার বলছে, আমি অসুস্থ। গত তিন-চার দিন আমরা কোনো মানুষের দেখা পাই নি। শুধু হেঁটেছি। দক্ষিণ দিকে, বাংলাদেশের সীমানা বামে রেখে মিয়ানমারের দিকে। শুধুই হেঁটেছি আমরা পাহাড়ের বুকে। অতি খাড়া ঢাল বেয়ে বেয়ে নিচে নামছি, নদী পার হচ্ছি, বড় বড় পাথর ডিঙিয়ে যাচ্ছি।

পাহাড়ের চূড়ায় বাতাস বইছে। দূর থেকে অন্য পাহাড়ের নীলাভ চূড়াগুলি দেখা যাচ্ছে। আমাদের ডানে মোদক পাহাড়শ্রেণি আর বামে মিরিঞ্জা। কখনো পাহাড়ের বুকে, কখনো ঢালু স্লোপে, কখনো ঝিরি দিয়ে পা ভিজিয়ে হাঁটছি। নদীর তলদেশে কাদা নয়, নুড়ি পাথর। তার উপর দিয়ে স্বচ্ছ পানি বয়ে যাচ্ছে। এখন মে মাস, পুরোপুরি গ্রীষ্ম। ঝিরির ঠান্ডা পানি পায়ের পাতায় স্বর্গীয় সুখের পরশ দিচ্ছে। দুই পাশে উঁচু উঁচু পাহাড়। মাঝে মাঝে আকাশ দেখা যাচ্ছে না। ঝিরিতে অন্ধকার আর শীতলতা নেমে এসেছে। পায়ের তলায় নুড়ি পাথর। শুকনো পাতা মড়মড় ভাঙছে। আমার গা ছমছম করছে। কখন জানি সাপের লেজে পা দেই!

দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের পাথুরে দেয়ালে বাধা পেয়ে প্রতিধ্বনি হচ্ছে। তাতে অদ্ভুত ভৌতিক শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে একটা দানব হো হো করে শিস বাজাচ্ছে। এই ব্যাপারটার সাথে আগে থেকে পরিচয় না থাকলে যে কেউ ভয় পেয়ে যাবে। গত কয়েক দিন আমরা ঝরনার পাশে তাবু পেতে ঘুমিয়েছি, ঝরনার পানি পান করেছি, রান্না করেছি খিচুড়ি আর ঝিরি থেকে ধরে আনা চিংড়ি মাছ।

এখানে পাহাড় আছে, আছে ঝরনা, ঝিরি, নদী। অবিরত পাহাড়শ্রেণি ঢেউ খেলছে সবুজ রং মেখে। দূরে পাহাড় চূড়ার হাতছানি, ঝরনার কলকল ধ্বনি, বুনো ফুল, অজানা পাখির গান, জুম ফসলের খেত। মাঝে মাঝে লুকোচুরি খেলে নীল আকাশ। নেই কেবল মানুষ, হলাহল, কোলাহল। তাই আমাদের শহুরে মানুষদের ভালো লাগবে কেন!

দুসরি বাজারে পলিনের মায়ের দোকান। এপথে যারা পাহাড়ে ট্রেক করতে যায়, সবাই একবার এই দোকানে আসে। হালকা শুকনো খাবার, বিস্কুট, পানি, খাবার স্যালাইন পাওয়া যায়। বাঁশ দিয়ে বানানো দোকান ঘর। সামনে কাঠের টুল পাতা। একটা বড় তেঁতুল গাছ দোকান ঘরটিকে ছাউনি দিয়ে রেখেছে। তার পাশেই নদী, নদীর নাম তৈন। এখানে একটা ঘাট রয়েছে, যদিও আজ কোনো নৌকা নেই।

মেয়েটিকে আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, মা কোথায়?

বলল, লামা গিয়েছে ভাইকে স্কুলে দেখে আসতে।

আমি তেঁতুল গাছের পাশে, দোকানের সামনে বসে পড়লাম। দোকানের একটা ঝাঁপ খোলা। মেয়েটি আমাকে জিজ্ঞেস করল, আপনার কি ক্ষুধা লেগেছে? আমি অতি দ্রুত উত্তর দিলাম, হ্যাঁ। সারাদিন ঝরনার পানি আর খাবার স্যালাইন ছাড়া কিছুই খাইনি। আমি আরো জানালাম, আমাদের কারো কাছে টাকা নেই। তোমাকে টাকা দিতে পারব না এখন।

সে বলল, আমি ভালো রান্না করতে পারি না। আমি বান্দরবান একটা হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করি। এখন কোভিডের কারণে স্কুল বন্ধ, তাই মাকে সাহায্য করতে চলে এসেছি। তার কথা চেহারার মতোই পরিষ্কার, ঝরঝরে। 'ই' ও 'উ'-এর ব্যবহার যথাযথ। একজন আদিবাসী কিশোরীর এত সুন্দর বাংলা বলা আমাকে অবাক করেছে। আমি এগিয়ে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এত সুন্দর বাংলা কীভাবে শিখলে?

পলিন আমাকে বলল, আমি ছোটবেলা থেকেই বাঙালিদের স্কুলে পড়েছি। তাদের সাথে থেকে শিখে নিয়েছি।

ইতিমধ্যে সে চুলায় ভাত বসিয়েছে। ঘরের ভেতর আলো কম। চুলার আগুনের আঁচ তার চাঁদমুখে এসে পড়ছে। আমি তার চোখ দেখতে পাচ্ছি না। সে রান্নায় সপ্রতিভ ও নিপুণ, আগের বলা কথার সাথে মিল নেই।

ইতিমধ্যে আমাদেরকে শরবত করে দিল। তেঁতুলের শরবত। তেঁতুল, লবণ, মরিচ—সাথে আর কী কী ছিল! আমার সাথের সহযাত্রীরা একটু মুখে দিয়ে গ্লাস রেখে দিল। আমি মজা করে খেলাম, পৃথিবীর সেরা পানীয়! মেয়েটির প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জন্মাতে লাগল। তার কিছুক্ষণ পরেই আমরা খেতে বসলাম বাঁশের মাচায়। খাবার—ভাত, আলু ভর্তা, টকফল দিয়ে ডাল। আলুর ভর্তায় শুকনো মাছ ভেজে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘর ভর্তি ধোঁয়া আর মাছ ভাজার গন্ধ।

খাবার শেষ করে আমি নদীর পাড়ে গিয়ে বসলাম। বাঁশের মাচা, পা ঝুলিয়ে বসা যায়। পুরো নদীটা এখন শূন্য। নদীর মাঝখানে পাথর, তারই ফাঁকে ফাঁকে স্বচ্ছ পানি বয়ে যাচ্ছে। শেষ বিকালে আদিবাসী তরুণীরা সেখানে গোসল করছেন। তাদের অনাবৃত শরীর, প্রায় উন্মুক্ত বুক। কেউ কেউ কাপড় বদলাচ্ছে নদীতেই। নদীর ওপাড়ে উঁচু পাহাড়চূড়া আকাশের প্রায় অর্ধেক আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। সূর্য দিগন্তে হারিয়ে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নদীপাড়ে এই আদিবাসী পাড়ায় অদ্ভুত মুগ্ধতা নেমে এসেছে। নিভে আসা সূর্যের হলুদ নরম আলো নীল পাহাড়ের গায়ে আস্তরণ তৈরি করেছে।

নদীর তলদেশে গর্ত খুঁড়ে ছোট কুয়া তৈরি করা হয়েছে, তাতে জমানো পানি সুপেয়। আমার ক্লান্ত শরীর খাবার আর বিশ্রাম পেয়ে আয়েশি হয়ে উঠেছে। আমার চোখ নিভু নিভু।

পলিন নদীর তলদেশ থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসছে খাড়া নদীর ঢাল বেয়ে। ইতিমধ্যে সে পোশাক বদলে নিয়েছে। পরনে থামিন, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক, পায়ে স্যান্ডেল। তার পিঠে বাঁশের থুরুং, তাতে দশ-এগারোটা পানির বোতল। নদীর তলার কুয়া থেকে সে খাবার পানি সংগ্রহ করে ফিরে যাচ্ছে। সে আমার দিকে গভীর ভাবে তাকাল। আমি তাকিয়ে আছি তার পায়ের গোড়ালির দিকে। ভাবছি কীভাবে স্যান্ডেল পায়ে এমন খাড়া পাহাড় বেয়ে মেয়েটি উঠে আসলো! পিঠে তার থুরুং, পানি ভর্তি। ভাবতে ভাবতে আমি ঘুমিয়ে গেলাম।

আমার ঘুম ভাঙল সন্ধ্যার বেশ পরে। আমি বাঁশের মাচায় ঘুমিয়েছিলাম। তেঁতুল গাছের নিচে বাতাস বইছে, আমার শরীর শীতল হয়ে আসছে। কেউ আমাকে জাগিয়ে দেয় নি, জাগিয়ে দেওয়ার কেউ নেই। আমি জেগেছি সক্রিয়ভাবে।

ধীরে ধীরে আমি দোকানের দিকে এগোতে থাকলাম। দোকানের ভেতর একটা কমলা আলোর বাতি জ্বলছে। পাশে মেয়েটি একটা চেয়ারে বসে আছে, তার সামনে খোলা বই।

আমি ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে গেলাম। এই পাহাড়ি জনপদে, এই পার্বত্য অঞ্চলে মেয়েটি একমাত্র আমার পরিচিত। অন্ধকারে যেভাবে বাতিটি আলো ছড়াচ্ছে, মেয়েটি আমার কাছে সেই আশার আলো—আমার একমাত্র আপনজন। বাধা না পেয়ে আমি তার পাশে একটা চেয়ারে বসে পড়লাম। আমার ইচ্ছা ছিল তাকে অনুরোধ করব যেন সকালে একটা নৌকা ঠিক করে দেয়, আর আমি আলীকদম চলে যেতে পারি।

আশেপাশের দোকান প্রায় বন্ধ। এখানে কোনো ক্রেতা নেই। আদিবাসী পাড়ায় সন্ধ্যা মানে গভীর রাত। দোকানের পেছনে একটা পাখি ডাকছে, পাশে তেঁতুল গাছে বাতাসের শনশনানি। নদীর তলদেশে পাথরের ফাঁকে ফাঁকে বয়ে যাচ্ছে তৈন। গ্রীষ্মের এই সন্ধ্যায় একটা আলোর বাতির বিপরীতে দুই জোড়া চোখ।

পলিন আমাকে বলল, দেখি আপনার মোবাইল ফোনটা দিন, গান শুনব। ফোন হাতে নিয়ে সে আমার গ্যালারির ছবি দেখতে লাগল। বলল, বাহ্‌, আপনি ভালো ছবি তোলেন! খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমার তোলা ফুলের ছবিগুলো দেখতে লাগল। "যারা ফুল পছন্দ করে তারা মানুষ ভালো"—বলে আমার চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিজে পরে নিল। তাকে দারুণ মানিয়েছে! মোটা ফ্রেমের কালো হাতলের চশমা, দেখতে তাকে স্কুলশিক্ষিকার মতো দেখাচ্ছে।

খুব সকালে আমার ঘুম ভেঙেছে। হেঁটে হেঁটে নদীর তলদেশে চলে এলাম। গত রাতে পানি কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু নৌকা চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত পানি নেই নদীতে। এই গ্রীষ্মের রোদে শুকিয়ে গেছে, সবাই বর্ষার অপেক্ষায় আছে। স্নিগ্ধ ভোরে আমি তৈন ধরে হাঁটছি। নুড়ি পাথর, ভেজা বালি আমার পায়ের তলায়। নুড়ি পাথরের ফাঁকে ফাঁকে তিরতির করে পানি নেমে যাচ্ছে। পাহাড়ের চূড়াগুলি মেঘে ঢেকে আছে, নদীর ওপরেও মেঘের আস্তরণ, ছাউনির মতো। পাহাড়ের উঁচু চূড়াটায় সকালের প্রথম সূর্যের আলো এসে পড়েছে। ঘন সবুজ পাহাড়ে সোনালী রোদের মাখামাখি, নিচে মেঘের আস্তরণ। নদীবক্ষে পুরোপুরি পবিত্র সকালের বাতাস।

আমি ট্যাংক টপ খুলে গলায় বেঁধে হাঁটছি। ডান পাশে কয়েকটা পাহাড়ি বাড়ি। কাঠের খুঁটির উপর বাঁশের মাচার ঘর। প্রশস্ত বাঁশের মাচা নদীর দিকে বাড়ানো, সেখানে বসে কাজ করছেন পাহাড়ি নারীরা। বাঁশের ঘরগুলো বুনো গাছ আড়াল করে রেখেছে। নদীর পাড়ে শনের মতো গাছ। একটা গয়াল ঘাস খাচ্ছে, গলায় দড়ি বাঁধা নেই। পাহাড়ের বুক ধরে পায়ে হাঁটা পথে কাজ করতে যাচ্ছেন কেউ কেউ, হাতে দা, পিঠে থুরুং, পুঁটলিতে কলাপাতা মোড়ানো ভাত। ফেরার পথে পাহাড় থেকে নিয়ে আসেন বাঁশ কোড়ল, বুনো মাশরুম, ঢেঁকিশাক, বুনো বেগুন, ঝাল মরিচ, গাছের মূল, কুড়িয়ে পাওয়া লাকড়ি।

প্রকৃতি, স্নিগ্ধতা, শুদ্ধতা আমাকে মোহিত করে তুলছে। ভোরের বাতাস, ভেজা বালি, মেঘমাখা পাহাড়চূড়া, প্রথম সোনালী আলো, আদিবাসী পাড়া, তৈন নদী আর পলিন। প্রকৃতি এখানে অবিরত, অবিরাম ও অসীম। সভ্যতার অনেক দূরে আদিম রূপ মেলে আছে। আগন্তুকের জন্য যথেষ্ট বিস্ময়কর!

নদীর একটা বড় কোমল পাথরের উপর পলিন দাঁড়িয়ে। সকালের বাতাসে তার চুল উড়ছে। পরনে লাল-খয়েরি মেশানো স্ট্রাইপড থামিন, খালি ভেজা পা—তুষারশুভ্র ও পবিত্র। আজ সকালের যত মায়া, যত স্নিগ্ধতা সব মেয়েটির মুখে এসে আশ্রয় নিয়েছে। সাদা মেঘের উপমা তার চেহারার প্রতিচ্ছবি, সিদ্ধার্থ গৌতমের পবিত্রতার ছাপ তার মাঝে।

আপনাকে খুঁজছি। কখন উঠেছেন? রাতে ঘুম হয়নি?—একটা তোয়ালে আমার হাতে দিয়ে বলল, গোসল করে নিন।

আমি তার কথা বিনা বাধায় মেনে নিয়ে ধীরে ধীরে পানিতে নেমে গেলাম, যেখানে পানির গভীরতা একটু বেশি। চারপাশে কোমল মাঝারি আকৃতির পাথর, কোটি বছরের স্মৃতি বয়ে চলেছে তারা। টারশিয়ারি যুগ থেকে এখানে ঠাঁই দাঁড়িয়ে। আমি কোমর পানিতে নেমে আসলাম। এটি একটু খুম, পানিতে উষ্ণতা—সকালে ঝরনা ও নদীর পানি যেমন উষ্ণ থাকে। হালকা স্রোত আছে। আমি মাথা নুয়ে ডুব দিয়ে শরীর আর চুল ভিজিয়ে নিলাম।

পলিন পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। আমাকে বলল, আপনি প্রার্থনা করেন নি? আমি বললাম, কীভাবে প্রার্থনা করতে হয়?

পলিনের হাতে আমার ট্যাংক টপ, তোয়ালে। আমি খুমে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে আছি। পলিন আবৃত্তি করছে, "হে পবিত্র ঈশ্বর, আমাদের শুদ্ধতম পিতা..."

আমি তাকিয়ে আছি নদীর বাঁকের দিকে যেখানে মেঘ ছাউনি হয়ে আস্তরণ করে রেখেছে। সকালের আলো উজ্জ্বল হতে শুরু করেছে, মেঘগুলো মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আমার কানে বাজছে, "হে পবিত্র ঈশ্বর, আমাদের শুদ্ধতম পিতা..."

নদীতে পর্যাপ্ত পানি নেই। কোনো মাঝি যেতে রাজি না, মাঝপথে বালিতে নৌকা আটকে যাবার ভয়। আজও আমাদের যাওয়া হচ্ছে না। এ খবর শুনে আমার খারাপ লাগছে না মোটেও। আমার বন্ধু বিরস মুখে হাতে একটা সিগারেট নিয়ে নদীর ঘাটের দিকে চলে গেল। অন্যজন গতকাল রাতে পাড়া থেকে গাইড নিয়ে পাহাড় ডিঙিয়ে থানচি-আলীকদম সড়কে চলে গেল, সেখান থেকে বাস ধরবে চট্টগ্রামের।

আমি দোকানের বাহিরে বসে ছিলাম, লম্বা বেঞ্চে। পলিন আমাকে বলল, আমি জুমে যাব। আপনি যাবেন সাথে?

নদীর ওপাড়ে পাহাড়ের ঢালে জুম। পুরোনো লতাপাতা-ঘাস পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখানে নতুন বীজ বোনা হবে—বেগুন, মরিচ, শসা। একসাথে অনেক ধরনের সবজির বীজ ছিটিয়ে বোনা হয়। পলিন আমার হাতে দা দিয়ে বলল ছোট অপ্রয়োজনীয় গাছ, লতাপাতাগুলো পরিষ্কার করতে। আমার মাঝারি লম্বা চুলগুলি কপালের সামনে চলে আসছে বারবার, আমি ঘেমে উঠছি।

পলিন পেছন থেকে আমার চুলগুলি মুঠো করে বেঁধে দিল তার চুলের রাবার খুলে। চারপাশে পোড়া পোড়া গন্ধ, শুকনো মাটি। ওপর থেকে নদীটা দেখা যাচ্ছে। নদীর তলদেশে সামান্য পানি, ডানপাশে একটা পাহাড়ের বাঁকে হঠাৎ করে হারিয়ে গেল। আমাদের কাজের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কোনোটাই নেই। মনে হলো কিশোরী মেয়েটি আমাকে দূরে সরিয়ে এনেছে এই নির্জন পাহাড়ি জুমে।

আমরা একটা পাথরের উপর বসে পড়লাম পা ঝুলিয়ে। সামনে তৈন, বাম পাশে অনেকগুলো পাতাঝরা গাছ, পেছনে বিস্তৃত শূন্য জুম। নদীর পাড়ে পলিনদের বাড়ির পেছনে জবা ফুল ফুটে আছে, পাশে একটা তেজপাতা গাছ আর বুনো ফুল—ক্যানভাসে মিলেমিশে একাকার।

আমি শহরে বড় হয়েছি। কত কত বন্ধু আমার, কত মানুষের সাথে মিশেছি, কারো সাথে এত সহজ মিল হয় নি আমার। প্রকৃতির মতোই স্বাভাবিক।

পলিন পা দুলোতে দুলোতে আমাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি ঢাকায় কী করেন?

আমি বললাম, হিসাবরক্ষক। একটা প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করি প্রায় পাঁচ বছর। আমি বললাম, চাকরিটা আমার পছন্দ না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শব্দহীন একটি রুমে আমার দিন কাটে। এভাবে সপ্তাহে ছয় দিন। ভোরের বাতাস, বিকালের রোদ, সন্ধ্যার পাখি কখন ঘরে ফেরে আমি জানি না। বাহিরে বৃষ্টি হলেও শব্দ পাই না আমি। মনিটরের নীল আলো আমার মনকে ক্লান্ত করে তুলছে।

তাহলে এমন চাকরি করছেন কেন?—সে বলল মাথা দোলাতে দোলাতে।

আমি প্রথমবারের মতো নিজেকে প্রশ্ন করলাম, আসলেই তো! কেন করছি? জীবন নিয়ে আলোচনা করার মতো উপযুক্ত স্থানে বসে আছি আমরা। আমার সঙ্গীটি কিশোরী হলেও তার জীবনবোধ গভীর ও পরিপূর্ণ। সে আমাকে প্রায় চেনে না। আমার বেড়ে ওঠা, ছেলেবেলার গল্প জানে না। আমাদের শহুরে জীবনের ব্যপ্তি, পরিধি সম্পর্কে তার ধারণা নেই। তারপরেও জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলার এত বড় সুযোগ কম আসে।

আমাকে বলল, যা ভালো লাগে না, তা জোর করে করার কী দরকার? জানেন, আমি একটা বই পড়েছি। সেখানে বলা আছে আমাদের জীবন হওয়া উচিত নদীর মতো। বইটার নাম 'টাক এভারলাস্টিং' (Tuck Everlasting)। একটা মেয়ে আছে যার নাম উইনি। সে একবার বাবার সাথে রাগ করে তাদের বাড়ির পেছনের জঙ্গলে হারিয়ে যায়। সেখানে সে একটা পরিবার খুঁজে পায়। পরিবারের সবাই ছিল অমর। তাদের সাথে উইনি থাকতে শুরু করে। উইনি বুঝতে শুরু করে, আমাদের জীবন একটা চলমান নদীর মতো। এই তৈন নদীর মতোই। এখানে বাতাস বয়ে যায়, ঢেউ ওঠে, বর্ষায় নদী ভরে ওঠে, নৌকা চলে, শীতে আবার নদী শুকিয়ে যায়, ঋতু বদলায়।

নদীর দিকে তাকিয়ে পলিন বলল, আপনার জীবনটা একটা পুকুরের মতো হয়ে গেছে। কোনো স্রোত নেই, ঢেউ নেই। স্থির পানি ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে যায়। বদ্ধ পানিতে সবুজ শ্যাওলার প্রলেপ বাড়ছে ধীরে ধীরে।

পলিনকে আমার আর সাধারণ আদিবাসী কিশোরী মনে হয় না। তার শান্ত, মাধুর্যভরা চেহারার গভীরে শক্তিশালী জীবনবোধ আমার শহুরে জীবনের দম্ভকে ভেঙেচুরে দিয়েছে। তার মসৃণ শ্যামল উপস্থিতি আমার গত জীবনের সকল অর্জন ম্লান করে দিচ্ছে। এত গভীর জীবনবোধ, এত সরল দার্শনিকতা কোথায় পেল সে? আমার শহরের তরুণেরা কিসের পেছনে ছুটছি তবে! আমার কেবলই মনে হলো, আমি হয়তো ভুল জীবন বেছে নিয়েছি।

হাওয়া এসে লাগল আমাদের গায়ে, বেশ আরাম লাগছে তাতে। তার চুল এসে পড়ছে আমার গালে, গলায়। মোবাইল ফোনে গান বাজছে,

"গাবুয্যা যেই বেরেয়োই

ত ঘরান চেবাত্তেই

তুই হুধু ঘর বানিয়্যচ

মরে লবাত্তেই।"

পাথর থেকে নেমে সে হেঁটে হেঁটে পাহাড়ের ঢালে চলে গেল অলক্ষ্যে, মৃদু লয়ে পা ফেলে। সে পরে এসেছে একটা কালো-খয়েরি রং মেশানো থামিন। কমলা রঙের ওর খারি। সে হাঁটছে পাহাড়ের নিচের দিকে, বাতাসে তার চুল উড়ছে। আমি তার পেছনে পেছনে এলাম। আমার হাতে দা, পিঠে থুরুং।

প্রতিদিন বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করি। বৃষ্টি হলে নদীতে পানি বাড়বে, আমরা নৌকা নিয়ে আলীকদম ফিরে যাব। অপেক্ষা সাধারণত মধুর হয় না, কিন্তু এখানে সুদীর্ঘ দিন। ভোর পাঁচটায় দিন শুরু হয়, তারপরে সকালটা শেষ হতেই চায় না। দিন বাড়ে না, স্থির হয়ে থাকে। আবার হঠাৎ করে দিনের আলো নিভে যায়, পাহাড়ের ওপারে সূর্যটা দপ করে নিভে মিলিয়ে যায়। আমি তৈনের পাড়ে বাঁশের মাচায় বসে থাকি। নীল পাহাড়ের গায়ে আকাশের ছায়া দেখি, দূরের জুমে কালো ধোঁয়া আকাশে মিশে যাওয়া দেখি।

গতকাল রাতে বৃষ্টি হলো। সকালে বৃষ্টি পড়ছে ঝিরঝির করে। নদীতে স্রোত, পাহাড় বেয়ে বেয়ে ঝরনা, ঝিরি হয়ে স্রোত নামছে তৈনের বুকে। ধীরে ধীরে মাতামুহুরী হয়ে সাগরে গিয়ে পড়বে। আজ আমরা ফিরে যাব। ব্যাগ গুছিয়ে নৌকায় উঠে পড়লাম। এটি একটি তামাক বোঝাই নৌকা, সাথে আমাদেরকেও নিয়ে যাবে মাঝি। আমার বন্ধুর বিরস মুখে হাসি, অন্যদিকে তাকিয়ে আরাম করে বিড়ি টানছে।

পলিন দাঁড়িয়ে আছে তেঁতুল গাছের নিচে। নৌকা চলতে শুরু করেছে। পাহাড়ের বাঁক ঘুরে দুসরি বাজার আমাদের চোখের আড়াল হয়ে গেল। তেঁতুল গাছটাকে আর দেখা গেল না। শুধু তৈনের স্রোত বয়ে গেল, সাথে নৌকার গতি।

দুই পাশে উজ্জ্বল সবুজ পাহাড়—গভীর ও গাঢ়। নৌকা যাচ্ছে স্রোতের সাথে সাথে, অলৌকিক নদীপথে। শত শত বাঁক, দুই পাশের পাহাড়চূড়ার হাতছানি, উপরে সাদা মেঘযুক্ত নীল আকাশ। আমার বন্ধু নদীর পানিতে ব্রাশ আর পেস্ট মিশিয়ে দাঁত ব্রাশ করছে।

সামনে নদীর বাঁকে পাহাড়ের ঢালে একটা জারুল গাছ, তার পাশে জুম ঘর। খয়েরি-বেগুনি ফুলে ভরে আছে জারুল গাছ। আমি তাকিয়ে আছি তার দিকে। ফুলেভরা জারুল গাছটা যত ছোট হতে লাগল, আমার কেবলই মনে হতে লাগল কিছু একটা ফেলে চলে যাচ্ছি! কিন্তু কী, আমি তা জানি না। আমার দুচোখের কোণ ভিজে গেল। হাহাকার নিয়ে আমি নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলাম দীর্ঘক্ষণ।

← Back to Travel Stories

Related stories

A traveler practicing yoga on the rocks beside the sea in Pondicherry
Pondicherry · People & Place

ঊর্ধভী, পন্ডিচেরি উপকূল

পন্ডিচেরির এক ভোরে ঊর্ধভীর সঙ্গে সমুদ্রের পথে হাঁটা। পুরোনো ফরাসি শহর, উপকূলের বাতাস আর কিছু পরিচিত হয়ে ওঠার মুহূর্ত।

Published 6 November 2026 · 4 min read
Read story ↗
Pai · Khong River · Culture & Community

সাম্বালা, ইউটোপিউয়ান জগৎ।

খং নদীর পাড়ে তাঁবু, গান আর নানা দেশ থেকে আসা মানুষ। সাম্বালার দিনগুলোতে প্রকৃতি ও একসঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে এই ভ্রমণলেখা।

Published 6 November 2026 · 6 min read
Read story ↗