← Travel StoriesPhi Phi Islands, Thailand · People & Connection

ফি ফি আইল্যান্ড, পাওলা আর আমি

আন্দামান সাগরের পিয়ারে এক গভীর রাতে পাওলার সঙ্গে কথোপকথন। চাঁদের আলো আর ঢেউয়ের মধ্যে উঠে আসে ঘর, শৈশব ও আপন ঠিকানার কথা।

Magsman at a viewpoint overlooking Phi Phi’s bays and limestone hills
Phi Phi Islands · Photograph published with the author’s travel feature in Dainik Shiksha.

রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। আমরা বসে আছি।

আন্দামান সাগরের এক কোনে, ফি ফি আইল্যান্ডে। চাঁদের মৃদু আলোয় সামনের নৌকাগুলো দুলছে। বাতাসে নোনা গন্ধ। মাঝে মাঝে দূরের কোন বার থেকে গানের শব্দ বাতাসে ভেসে আসছে। নিচে অন্ধকার পানিতে ছোট ছোট মাছ আলো কেটে চলে যাচ্ছে। সাগরের পানিতে ভাঙা চাদের প্রতিবিম্ব। দ্বীপের দক্ষিণ দিকে আইল্যান্ডের পিয়ারে বসে আছি আমরা দুইজন। আমি আর মেক্সিকান মেয়ে পাওলা। এইদিকে আর কেউ নেই। সবাই পাব, বারে গিয়ে ভীড় করেছে। তাই এইদিকটা একেবারে ফাঁকা। আমারা হেঁটে হেঁটে একেবারে পিয়ারের মাথায় চলে এসেছি।

পাওলা বসেছে একটু উপরে। আমি সিঁড়ির এক ধাপ নিচে, পাওলার পায়ের কাছে সমান্তরাল ভাবে। আমাদের দুইজনের পা ঝুলছে পানির উপরে। পূর্ব দিকে মুখ করে ।আমাদের দুইপাশেই দুইটা পাহাড় চূড়া। সামনে বিস্তৃত সাগরের উপরে, পাহাড়ের চূড়ার চাঁদ আলো দিচ্ছে। জ্বল জ্বল করছে সমুদ্রের নীলাভ পানি। সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে অবিরাম বাতাস আমাদের গায়ে এসে লাগছে। আমার বুক খোলা হাওয়াইন শার্টটা উড়ে যাচ্ছে। পাওলার সোনালী চুল গুলো অবাধ্য। সে হাত দিয়ে চুল গুলো কানের পিছিনে সরিয়ে দিল। চুল সরাতে গিয়ে পাওলার জো (Jaw) লাইনটা আমার নজরে আসলো। শক্তিশালী চোয়াল। মসৃণ গ্রীবা। একবার আমার একটু ছুয়ে দেখার ইচ্ছা হলো। আমাদের মাঝে অদৃশ্য ভদ্রতা, সেই দূরত্বটুকু অতিক্রম করতে পারেনি। কিছু সৌন্দর্য দূর থেকেই দেখতে হয়।

আমাদের দৃষ্টি পাহাড় চূড়ার ওপরে। আকাশের দিকে। রূপালী চাঁদের দিকে। সাগরের ঢেউ পিয়ারে আছড়ে পড়ছে। নৌকাগুলো দুলছে। আমারা কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। কেবল কথা শুনতে পাচ্ছি।

আমাদের মধ্যে খুব প্রয়োজনীয় কথা হচ্ছে না। কেবল ছেলেবেলার কথা। কি কি কার্টুন দেখেছি আমারা ছেলেবেলায়। আমি বললাম, Bananas in Pajamas এর কথা। খুব ধীরে ধীরে। ঠান্ডা গলায়। পাওলা তার মেয়েবেলার কথা বলতে শুরু করেছে। তার পরিবারের কথা। কিভাবে তার বাবা-মা মেক্সিকো থেকে টেক্সাসে এসে বসবাস শুরু করেছে। পাওলা তার মায়ের গল্প বলছে এখন। ওর মা কত সুন্দর নাচ করতো। আজ বিকালে পাওলার মায়ের সাথে আমি কথা বলেছি। ভিডিও কলে। পাওলা আমার দিকে ফোন বাড়িয়ে দিয়ে বললো, মাই মমি। খুবই সংক্ষিপ্ত কথোপকথন। আমি বললাম, পাওলা ইজ উইথ মি। আই উইল টেক কেয়ার অফ হার। তার মায়ের সুন্দর একটা ছবি দেখলাম। ডায়না কাটের চুল। মাথায় হ্যাট। ফ্লোরাল স্কাট পড়া একজন ত্রিশ ঊর্ধব নারী একটা বাড়ির সামনে দাড়িয়ে আছেন। পায়ে কালো জুতা। কোলে একটা ফুটফুটে মেয়ে বাচ্চা। পাওলা বললো, এটা আমি। আমার ছোটবেলার ছবি। পাওলা আবারও বললো, তার মা কত সুন্দর নাচ করতো। পাওলার আক্ষেপ সে তার মায়ের মত নাচতে জানে না।

হঠাৎ পাওলা চুপ হয়ে গেল। সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ছে পিয়ারে।পাওলা খুব ভীত।ভয় পাচ্ছে তার বাবা-মাকে নিয়ে। হয়ত তার বাবা-মাকে আমিরিকান কর্তৃপক্ষ মেক্সিকো তে ফেরত পাঠাতে পারে। মেক্সিকোর মাফিয়া কালচারের ভয়ে পাওলা বারবার শিউরে উঠছে। পৃথিবীকে পাওলা এখনো নিরাপদ মনে করে না। ভায়োল্যান্স, মারামারি, মানুষ খুন, মাফিয়াদের ভয় পাওলাকে তাড়া করে।

আমার মন ভারি হয়ে যাচ্ছে। কোন এক অজানা কারণে। বলতে গিয়ে কথা জড়িয়ে আসছে আমার। আমি বুঝতে পারছিলাম না কেন মনটা এত ভারী হয়ে উঠছে। পাওলার পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে? নাকি এই রাতটা শেষ হয়ে যাবে বলে? হয়তো কোনটাই না। মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলোকে ধরে রাখা যায় না বলেই তারা এত সুন্দর। আমি জানতাম, কয়েকদিন পরে আমরা হয়তো দুই দেশে চলে যাব। এই পিয়ার, এই চাদ, এই কথোপকথন। স্মৃতি হয়ে যাবে। সেই ভবিষ্যতের বিচ্ছেদ যেন আগেই এসে বসেছিল আমাদের মাঝখানে।

আমি ধীরে ধীরে বলে গেলাম, কিভাবে বাংলাদেশের একটা ছোট গ্রামে আমার ছেলেবেলা কেটেছে। বর্ষা ও প্রকৃতির মধ্যে। গ্রামের এক মাথায় ছিল আমাদের বাড়ি। তারপর ধানক্ষেত। সামনে সুদূর নীল আকাশ। মেঘের উড়াউড়ি। সবুজ দিগন্ত। হাসের বাচ্চাদের জলের উপর ভেসে ভেড়ানো। শীতের কুয়াশা মাখা বিকেল। কিভাবে আমি সরিষা ফুলের মাঠ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতাম। খালের উপর বাশের সাকো।

মেক্সিকো আর বাংলাদেশের দূরত্ব কত। আমারা দুইজন বেড়ে উঠেছি দুই মহাদেশে। তার ছিল মরুভূমির গরম, আমার ছিল বর্ষার জল। আমার ছিল ছিল ধান ক্ষেতের আইল, তার ছিল টেক্সাসের হাইওয়ে। ভৌগোলিক দূরত্বের ছেয়েও আমাদের ছেলেবেলার স্মৃতিগুলো অনেক কাছাকাছি। আজ আন্দামান সাগরের রাত আমাদের দূরত্ব কমিয়ে দিয়েছে।

পাওলা হাটুর উপর মুখ রেখে স্প্যানিশ গান গাইছে। তার কিছুই আমি বুঝি না। সুরের একটা শ্বাশত রূপ আছে। যা আমাকে ছুয়ে দিচ্ছে। আমি তাকিয়ে আছি ডান পাশের পাহাড় চূড়ার দিকে। আলো-আধারি পরিবেশ। জীবন বড় রহস্যময়। আমরা এত কাছাকাছি। আমাদের আবেগ আরো নিবিড়। কিন্তু কোন এক অজানা দেয়াল আমাদেরকে আলাদা করে রেখেছে। পাওলা কিংবা আমি কেউই সেই জড়তার দেয়াল টপকে আসতে পারিনি। আমরা কেউই একে অপরকে ছুয়ে দেখিনি। প্রয়োজনও ছিল না। কিছু সম্পর্ক স্পর্শের জন্য তৈরি হয় না। তারা জন্মায় পাশাপাশি বসে থাকার জন্য, একই চাঁদ দেখার জন্য। কিংবা এমন কিছু কথা বলার জন্য, যেগুলো আর কোনোদিন কাউকে বলা হবে না।এই রাতের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। আগামীকাল আমরা আবার ভ্রমণকারী হয়ে যাব। হয়তো অন্য কোনো দেশে, অন্য কোনো শহরে। অপরিচিত অন্য কারও পাশে বসব। তবু এই রাত আলাদা থাকবে। কারণ এই রাত আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল, পৃথিবী যত বড়ই হোক মানুষের একাকীত্বের পরিধির থেকে তা অনেক ছোট।

পাওলা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, তোমার কি বাড়ির কথা মনে পড়ে?

আমি অন্ধকারে তাকিয়ে বললাম, আমি আমার হারিয়ে যাওয়া গ্রামটার কথা মনে পড়ে। কন্ঠে বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, গ্রাম হারিয়ে গেছে মানে কি?

আমি শান্তভাবে বললাম, আমার ছেলেবেলার বেড়ে উঠা গ্রামটি বদলে গেছে তা আর আগের মত নাই। আমি আমার সেই ছেলেবেলার সময়টাকে মিস করি।

সে অন্ধাকারে মাথা নাড়িয়ে বললো, এই জন্য আমরা পৃথিবী ঘুরে বেড়াই।

আমি হেসে বললা, টু ফাইন্ড এ্যা নিউ হোম।

পাওলা মাথা ঝাকিয়ে বললো, না, আমরা দেখতে চাই। আমারা ইতিমধ্যে কি কি হারিয়ে ফেলেছি।

তারপর আবার নিরবতা। ঢেউয়ের শব্দ। পানির ওপ্র রূপালি চাদের কিরন। অতিদূরে জেগে থাকা নিকোবোর দীপপুঞ্জ।

পাওলা হঠাৎ করে বললো, তুমি জানো আমার কোন বাড়ি নেই। আমি বললাম, কেন টেক্সাস তোমার জন্মস্থান না?

সে হতাশ মেখে বললো, আমিরিকানরা মনে করে আমি মাইগ্রেন্ট। মেক্সিকান। মেক্সিকানরা বলে আমি আমিরিকান।

আমি উত্তরে কিছু বললাম না। কথাগুলো আমার কাছে বেশ পরিচিত লাগছে।

একটু পরে দূরে আকাশের দিকে তাকিয়ে পাওলা বললো, বাংলাদেশে ফিরে প্রথমে কি করবে?

আমি বললাম, বৃষ্টির পরে ধান ক্ষেতের আইল দিয়ে হাটতে চাই। সে আমার অন্ধকারে আমার দিকে লম্বা করে দৃষ্টি দিল। বললো, খুব নির্দিষ্ট কিছু?

আমি বললাম, তোমার কথা বল।

কন্ঠে উচ্ছ্বাস নিয়ে বললো, আমার মায়ের সাথে নাচতে চাই। অনেক দিন হলো নাচি না।

তারপরে আর কথা হয়নি আমাদের। ধীরে ধীরে রাত বাড়ছে। চাঁদ হেলে পড়ছে। পাহাড়ের ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে। গানের ভেসে আসা সুর থেমে গেছে। মনে হচ্ছে পুরো দ্বীপটা যেন ঘুমিয়ে পড়েছে এখন। কেবল সমুদ্রের ঘুম আসে না। সাগরের বিরামহীন ঢেউ আছড়ে পড়ছে বালির তীরে নয়, আমাদের বুকে।

← Back to Travel Stories

Related stories

A traveler practicing yoga on the rocks beside the sea in Pondicherry
Pondicherry · People & Place

ঊর্ধভী, পন্ডিচেরি উপকূল

পন্ডিচেরির এক ভোরে ঊর্ধভীর সঙ্গে সমুদ্রের পথে হাঁটা। পুরোনো ফরাসি শহর, উপকূলের বাতাস আর কিছু পরিচিত হয়ে ওঠার মুহূর্ত।

Published 6 November 2026 · 4 min read
Read story ↗
Pai · Khong River · Culture & Community

সাম্বালা, ইউটোপিউয়ান জগৎ।

খং নদীর পাড়ে তাঁবু, গান আর নানা দেশ থেকে আসা মানুষ। সাম্বালার দিনগুলোতে প্রকৃতি ও একসঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে এই ভ্রমণলেখা।

Published 6 November 2026 · 6 min read
Read story ↗