← Travel StoriesPuerto Galera, Philippines · People & Connection

মনিকা, সাউথ চায়না সি

পুয়ের্তো গালেরায় সমুদ্রের ধারে মনিকার সঙ্গে এক সন্ধ্যা। ঢেউ, নোনা বাতাস আর চাঁদের আলোর মধ্যে দুই ভ্রমণকারীর কথোপকথন।

সাউথ চায়না সি। হান মেয়ে মনিকা আমার পাশে।

আমরা বসে আছি Puerto Galera-তে। সমুদ্র এখন ভরা। ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। সামনে বোটগুলো দুলছে। কিছুক্ষণ আগে সন্ধ্যা হলো। আকাশে কমলা রঙের আলোর রেখাগুলো এখনো মিলিয়ে যায়নি। ঢেউগুলো আরো শক্তি নিয়ে আছড়ে পড়ছে পাথরে। একটা সাদা রঙের মাইক্রোনেশিয়ান বোট ঢেউয়ের সাথে সঙ্গমরত। কয়েকটা কাঁকড়া গুটি গুটি পায়ে ফোকর থেকে বের হয়ে আসছে। আবার দৌড়ে ফোকরে ঢুকে যাচ্ছে।

আমরা বসে আছি একটা রিজের উপর। পা ঝুলিয়ে। সমুদ্রের বাতাসের ঝাপটা চুল উড়িয়ে দিচ্ছে বারবার। আমাদের দুজনের চুল প্রায় সমান। বাতাসে রুক্ষ আর নোনা গন্ধ। এই বে (bay)-এর উল্টো পাশে রয়েছে একটা আগ্নেয়গিরি। নাম তাল (Taal Volcano)। আমার খুব মন চাইছে এখনই অগ্ন্যুৎপাত শুরু হোক। লাল লাভা ছড়িয়ে পড়ুক সন্ধ্যার আকাশে।

মনিকাকে বললাম, তোমার আসল নাম কী?

সে বলল, আমি বলব না। বিদেশিদেরকে আমি নামের উচ্চারণ শেখাতে গিয়ে ক্লান্ত। মনিকা গত নয় মাস ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আগামী সপ্তাহে আবার চায়না চলে যাবে। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া হয়ে এখন ফিলিপাইন। আমরা একটা ইকো হোস্টেলে থাকি। সারাদিন বৃষ্টি দেখি বারান্দায় বসে। চা খাই। মনিকা তার ব্যাগ থেকে আমাকে চা বের করে দিল। আমাদের মতো চা পাতা নয়। কালো চকোলেটের মতো টুকরো। সলিড, শক্ত।

জিজ্ঞেস করলাম, চায়নায় তো তোমার বাড়ি, তা বাড়ি কোথায়?

বলল, শানদং (Tengzhou)। কনফুসিয়াসের শহর। চেনো তাকে? বললাম, কৃষকের মেয়ে বিয়ে করা সেই প্রাচীন চৈনিক দার্শনিক তো! সে পাতলা ঠোঁটে হাসি দিল।

মনিকা বলল, খুব সুন্দর একটা শহর—শানদং। Yellow River-এর পাড়ে। ওপাড়ে কোরিয়া, এপাড়ে চায়না। আমার শহরে খুব সুন্দর বসন্ত হয়। ফুলে ফুলে ভরে যায়। যেখানে যাবে তোমার ভালো লাগবে। আমরা সর্বত্র কনফুসিয়াসকে অনুভব করি।

আমাদের বাম পাশে একটা তারা জ্বলে উঠল। ধীরে ধীরে আরো কয়েকটি। সেই পরিচিত প্যাটার্ন দৃশ্যমান হলো। আমি বাম পাশে তাকিয়ে খুব খুশি হয়ে গেলাম। ছোটবেলার আমার সেই স্বপ্ন। মনে হচ্ছে বহু বছর পর আমি আবার সেই স্বপ্ন দেখছি।

ছেলেবেলার স্বপ্নে আকাশে উজ্জ্বল কোনো একটা প্যাটার্ন দেখাতাম আমি। শীতের বিকেল। খোলা মাঠ। ধান কেটে নিয়ে গেছে কৃষকেরা। শূন্য মাঠের কোণে একফালি সরিষা খেত। হলুদ রঙের সরিষা ফুলে ছেয়ে গেছে গাঢ় সবুজ পাতার মুকুট। বাতাসে দোল খাচ্ছে। মৌমাছি উড়ছে হলুদ ফুলের উপর। চারপাশে মিষ্টি একটা গন্ধ ছড়িয়ে আছে।

কুয়াশা ঘন হয়ে আসছে। আকাশের তলে কুয়াশার পাতলা লেয়ার। মনে হচ্ছে আকাশের নিচে আরেক আকাশ। দিগন্তজোড়া ধূসর মাঠ। মাঠের ওপাশে গ্রামের ছায়া। গাছের সারি। এই গ্রামগুলো আমার পরিচিত। কিন্তু আমি চিনতে পারছি না। ছাইরঙা আকাশের নিচে, শীতের বিকেলের কুয়াশামাখা গ্রাম। গাছের কালো ছায়া। এ কোনো পরিচিত গ্রাম নয়। আমি দাঁড়িয়ে আছি দূরের নক্ষত্রের কিনারে অজানা গ্রহের একটি গ্রামে।

কয়েকটি ছেলে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। পাতার ঘুড়ি। বড় বড় পাতা পরজীবী হিসেবে খেজুর গাছ, তাল গাছে জন্মায়। শুকিয়ে গেলে সেগুলো ঘুড়ির মতো আকার ধারণ করে। সুতো বেঁধে সেগুলো হালকা বাতাসে ঘুড়ির মতো ওড়ানো যায়। ছেলেগুলো আমার প্রতিবেশী। কিন্তু কাউকে আমি চিনতে পারছি না। কারণ আমি অনেক খুশি। আমি তাকিয়ে আছি বাম পাশের আকাশের দিকে। রঙের প্যাটার্নের দিকে। আইলের উপর দাঁড়িয়ে আমি। সামনে শূন্য, শুকনো ক্ষেত। কয়েকটি ছোট ছোট ছেলে ও ফ্রক পরা মেয়ে গোল্লাছুট খেলছে। তাদের হইচই আমার কানে এসে লাগছে।

আমি আঙুল দিয়ে ইশারা করে মনিকাকে বললাম, দেখ আকাশে তারা উঠেছে। নৌকাগুলো জোরে জোরে দুলছে আরো। একটা বড় মেঘের ছাই ভেসে যাচ্ছে সামনে। কিছুক্ষণ পরপর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মনিকা তার দিকে উচ্ছ্বসিত হয়ে তাকাচ্ছে।

আমি আরো বললাম, ছেলেবেলায় কখনো তারা গুনেছ?

মনিকা বলল, কত শত বার।

ভেবে আমার ভীষণ ভালো লাগল চীনে একটা মেয়ে আমার ছেলেবেলার মতোই বেড়ে উঠেছে। মনিকার বয়স আমার কাছাকাছি।

সাগরের মাদকতা আমাদেরকে আনমনা করে তুলছে। মঙ্গোলিয়া, আফিম যুদ্ধ, মিং ডাইনেস্টি—কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না আমাদের কথপোকথনে।

নৌকাগুলো দুলছে। সাগর ধীরে ধীরে আলোকিত হয়ে উঠছে। ফ্লোরোসেন্স মিশে গেছে নোনা জলে। সাগর উজ্জ্বল, আমরা তার ছায়াতে। পেছনে কয়েকটি নারকেল গাছ। পাতায় তাদের শনশন শব্দ। সাগরের প্রতিফলিত আলো আমাদের চোখে এসে লাগছে। ধীরে ধীরে তা চোখের ভেতর দিয়ে শরীরে প্রবেশ করছে আমাদের। আমার হাতে কোরিয়ান সুজোর বোতল। কিন্তু চুমুক দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি না।

ঢেউ এসে আমাদের পায়ের কাছে আছড়ে পড়ছে। সাগর ফুলছে। আকাশের চাঁদের সাথে সাগরের মিল। তাদের প্রণয় চলছে এখন। এই ঘনিষ্ঠতা আদি। অত্যন্ত প্রাচীন। মানুষ মানুষকে ভালোবেসে কাছে টানছে, তারও বহু শতাব্দী আগের।

আমাদের পায়ে, জুতোয় ঢেউয়ের ছিটানো পানি এসে লাগছে।

আমরা কিছুটা পিছিয়ে এসে, ধীরে ধীরে রাস্তায় উঠে আসলাম। কয়েকটা কুকুর ঘুমাচ্ছে গলির মুখে। নারকেল পাতার পেছনে চাঁদটা একটা গমের রুটির মতো মেঘের আড়ালে হাসছে। খুব উজ্জ্বল নয়। কালো কালো ডাল-পালা মুখে। হেঁটে হেঁটে আমরা হোস্টেলের কাছে চলে আসলাম। সামনের রাস্তাটা উঁচু। স্লোপ। হাঁটুতে শক্তি বাড়িয়ে উপরে উঠছি ধীরে ধীরে।

ভারী নিঃশ্বাস ফেলে মনিকা বলল, Yue-guang (ইউয়ে গুয়াং)।

আমি বললাম, হু।

← Back to Travel Stories

Related stories

A traveler practicing yoga on the rocks beside the sea in Pondicherry
Pondicherry · People & Place

ঊর্ধভী, পন্ডিচেরি উপকূল

পন্ডিচেরির এক ভোরে ঊর্ধভীর সঙ্গে সমুদ্রের পথে হাঁটা। পুরোনো ফরাসি শহর, উপকূলের বাতাস আর কিছু পরিচিত হয়ে ওঠার মুহূর্ত।

Published 6 November 2026 · 4 min read
Read story ↗
Pai · Khong River · Culture & Community

সাম্বালা, ইউটোপিউয়ান জগৎ।

খং নদীর পাড়ে তাঁবু, গান আর নানা দেশ থেকে আসা মানুষ। সাম্বালার দিনগুলোতে প্রকৃতি ও একসঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে এই ভ্রমণলেখা।

Published 6 November 2026 · 6 min read
Read story ↗