মিজো, আইজল শহর
আইজলের পাহাড়ি শহরে একটি খাবারের দোকান ও সেখানকার মানুষের সঙ্গে পরিচয়। অল্প সময়ের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার স্মৃতি নিয়ে পথ চলা।
আইজল শহরে পাহাড়ের ঢালে ছোট একটি খাবারের দোকান। স্থানীয় শ্রমিক শ্রেণীর মানুষেরা খাবার খায়। আমরাও খাবার খেতে প্রবেশ করলাম। উঁচু হিলের জুতো, গাঢ় বেগুনি রঙের একটা জামা পরে মেয়েটি সবাইকে খাবার সাজিয়ে দিচ্ছে। গলায় তার নেকটাইয়ের মতো ফিতা বাঁধা, কোমরের কাছে জামাটা আঁটো করে বাঁধা, পরিপাটি।
হালকা চুল, কানে বড় বড় ইয়ার রিং। তার চেহারায় শুভ্রতা ও পবিত্রতার ছাপ। চিবুকের কাছে কালো রঙের (কাজল হতে পারে) দুইটা ফোঁটা দেওয়া।
ময়লা ফ্লোর, শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ খাবার খাচ্ছে, কিছুটা শোরগোল, সামনে খাবারের ডিশগুলো উন্মুক্ত। পেছনে হাত ধোয়ার বেসিন। দুই টেবিলের মাঝখান দিয়ে সে বারবার খাবার নিয়ে টেবিলে টেবিলে আসা-যাওয়া করছে। সে হাঁটছে কায়দা করে। তার হেঁটে চলা তরঙ্গায়িত। হাই হিল তার কোমরটিকে আরো বেশি করে দুলিয়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে র্যাম্প শো। দুই পাশের ক্ষুধার্ত মানুষগুলো তার দর্শক। হাততালি নেই। জাঁকজমক নেই। আহা, অ্যাডমায়ারের বড় অভাব।
এক প্লেট সালাদ আমাদের টেবিলে রেখে আমার পেছনে চেয়ার টেনে বসে পড়ল। আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালাম। যে আগুন আমাকে দূর থেকে তাতিয়ে যাচ্ছে, তা এখন আমার কোলের কাছে। আমি মুখ থেকে খাবারের চামচ নামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী নাম তোমার?
বলল, মাও (Mao)।
মাওদের সুন্দর একটি শহর। পাহাড় আর মেঘ যেখানে মিলেছে, শহরটির অবস্থান সেখানে। পাহাড়ের মাথায় সুন্দর সুন্দর বাড়ি। খুব উঁচু, ঢালু রাস্তা। গির্জা। ছোট ছোট বাড়িগুলো নানান উজ্জ্বল রঙের। মেঘ তাদেরকে ঘিরে রাখে। পাতলা মেঘের আড়াল দিয়ে তাকালে শহরটি পরাবাস্তব শহর মনে হয়। মনে হয় এ পৃথিবীর কোনো স্থান নয়, দূরের অজানা গ্রহের অপরিচিত এলিয়েনদের শহর।
আইজল শহর থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে তাদের এয়ারপোর্ট। আমরা আকাশা নামের একটা লোকাল বিমান করে মণিপুর থেকে এলাম এখানে। বিমানের জানালা যেন টেলিভিশন। নিচে সারি সারি সবুজ পাহাড়। তার ওপরে হালকা আস্তরণের মেঘ ভেসে যাচ্ছে। এতে পাহাড়চূড়াগুলোকে আরো মোহনীয় লাগছে। এত বড় দিগন্তজোড়া পাহাড়ের শ্রেণী, তার যেন অন্ত নাই। সবুজ রঙটা চোখে বেশ লাগছে।
ট্যাক্সি করে আইজল শহরে ফিরছি আমরা। পাহাড়, গিরিখাত, অতি উঁচু-নিচু রাস্তা, দুই পাহাড়ের মাঝে ব্রিজ। কখনো পাহাড়চূড়ায়, কখনো তার পাদদেশে। শহরের কাছাকাছি আমরা। বড় অলৌকিক, বড় অপার্থিব দৃশ্য আমার সামনে। এ আমাদের চেনা পৃথিবী নয়। এখানে আমি কখনো আসি নাই।
আকাশে ঝুলছে একটা শহর। চারপাশে মেঘ—কোথাও হালকা, কোথাও গাঢ়। মেঘ শহরের বাড়িগুলোকে আড়াল করে রেখেছে। মেঘের ফাঁক দিয়ে আমি দেখতে পাচ্ছি রঙিন সব দালান। গির্জার ক্রসের মাথা। আমরা তখনো অনেক নিচে। শহরটি আমাদের মাথার উপরে সামনে ভাসছে। গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ হুংকারে বাড়ছে। যত এগোচ্ছি, ততই পরাবাস্তব একটা অচেনা ঝুলন্ত শহরের দিকে প্রবেশ করছি।
রবিবারের আইজল। আজকে এখানে ড্রাই ডে। দোকানপাট প্রায় বন্ধ। পাহাড়ের মতো বাড়িঘরগুলো ঢেউ খেলানো। এত উঁচু রাস্তা আমরা হেঁটেই উঠতে পারছিলাম না। তাতে বাচ্চারা ফুটবল খেলছে। কেউ কেউ স্কেটিং করছে। মনে হচ্ছে এদের পায়ের গঠন শেরপাদের মতোই। আমাদেরকে দেখে ওরা কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে। রাস্তায় ছেলের তুলনায় মেয়ের সংখ্যা বেশি। সুন্দর परिपाটি। দুই-তিনজন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। এখানে মেয়েরা স্কুটি চালায়, সাথে পেছনে আরেকজনকে নিয়ে। পেছনে একজন পুরুষ মানুষ থাকে মেয়েটির কোমর জড়িয়ে। তা দেখতে বেমানান লাগার কথা না।
মিজোরা মাতৃতান্ত্রিক। সমাজ ও পরিবারে মেয়েদের প্রভাব বেশি। সংসার, ব্যবসা পরিচালনা, যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণের কাজগুলো মেয়েরাই করে। প্রত্যেক দোকানে পুরুষের পরিবর্তে নারী ম্যানেজারকে বসে থাকতে দেখা যায়। আমাদের সামনে দিয়ে স্কুটি চালিয়ে চলে যাচ্ছে মেয়েরা। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মেয়েদের আমার সব সময় ভালো লাগে। তারা শান্ত, স্নিগ্ধ, মোলায়েম, খুব পরিষ্কার। নিজেদেরকে পরিপাটি রাখতে পছন্দ করে। সুন্দর সুন্দর জুতো পরে। গায়ে থাকে মিষ্টি সুঘ্রাণ। মিজো মেয়েদের কটিদেশ সবচেয়ে সুন্দর ও সুগঠিত। থামিন পরলে আরো ভারী সুন্দর ও আকর্ষণীয় লাগে। থামিন পরে স্কুটি চালিয়ে চলে গেল একটা মেয়ে। বাতাসে তার চুল উড়ছে।
দুপুর থেকে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। আমি হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ঢেউয়ের মতো শহর আগে তো দেখিনি। পাহাড়ের দেওয়ালে সবুজ শ্যাওলা। বাড়িতে ঝুলছে অর্কিড ফুল। বাড়ির রেলিংয়ের উপর ঘুমাচ্ছে বিড়াল। খাড়া রাস্তার বাঁকে ফুল গাছ, কিংবা সিঁড়ি নেমে গেছে নিচে আরেকটা রাস্তায়। আইজল আমাদের কত কাছে, বড়জোর দুই-আড়াইশ কিলোমিটার; অথচ তাদের ব্যাপারে আমরা কত কম জানি। এমন শহরে আমি কখনো ঘুরতে আসি নাই। আইজল আমাকে মুগ্ধতা আর রহস্যে অতৃপ্ত করে রেখেছে।
পাহাড়ে হঠাৎ করে সন্ধ্যা নামে। চূড়ার আড়ালে সূর্য নেমে গেলে অন্ধকার হয়ে যায়। আমরা হেঁটে হেঁটে নির্জনতা থেকে শহরের প্রাণকেন্দ্রের দিকে চলছি এখন। পেছনে আঁধার ঘনিয়ে আসছে। এক বাড়ি থেকে একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাচ্ছে। আমি ঘুরে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকে দেখলাম। তার সাথে হাসি বিনিময় করলাম।
তাদের সুখী সুখী জীবন দেখে আমি হতবাকই হলাম। তাদের এই সুখের রহস্য আমাকে ব্যাকুল করে তুলেছে। কিছুটা ঈর্ষান্বিতও হয়ে, অতৃপ্তি নিয়ে শিলচরের জিপে উঠতে বাধ্য হলাম। আচ্ছা, মাওদের এত সুখী থাকার রহস্য কী? আমাদের সাথে এক মুহূর্ত আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য ভীষণ কৃতজ্ঞ আমরা। 🌻❤️🌍
← Back to Travel Stories