জিং জিং এবং ডালি শহর
পাই শহরে জিং জিং ও তাঁর মায়ের সঙ্গে পরিচয়। ডালি শহরের স্মৃতি আর বাংলাদেশের পুরোনো এক সংবাদ মিলিয়ে দুই দেশের মানুষের নতুন করে কাছাকাছি আসার গল্প।
ঊনিশ’শো একানব্বই সাল। এপ্রিল মাস।
চীনের ডালি শহরে লেকের পাড়ে একটা ছোট সাজানো বাড়িতে বসে খাবার খাচ্ছে একটি কিশোর ছেলে। নাম জিং জিং। ছেলেটির মা তাকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। সামনে টেলিভিশন চলছে। চারপায়া কাঠের ফ্রেমের টেলিভিশন। দেখতে চারকোনা বাক্স। ছেলেটির বাম হাতে চামচ। চোখ টেলিভিশনের পর্দায়। অদক্ষভাবে খাবার মুখে তুলে নিচ্ছে।
এখন বিশ্ব সংবাদ। বাংলাদেশে প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় এক লক্ষ লোক মারা গিয়েছে। বহু মানুষ হতাহত। মানবেতর জীবনযাপন করছেন কোটি মানুষ.....
জিং জিংয়ের মা রান্নাঘর থেকে খাবারের বাটি নিয়ে প্রবেশ করলেন। তার পরনে শেফ ইউনিফর্ম। টেবিলের উপর খাবার রাখতে গিয়ে তিনি লম্বা করে টেলিভিশনের দিকে তাকালেন। উৎকণ্ঠা নিয়ে বললেন, আহারে! গরিব বাংলাদেশি!! সব মরে গেল।
ছেলেটি তার মায়ের মুখের দিকে তাকাল। বোঝার চেষ্টা করল, কারা মরে গেছে! চামচ নামিয়ে মাকে আবার জিজ্ঞেস করল, মা, বাংলাদেশ কোথায়? জিং জিং কিশোর একটি ছেলে। কৌতূহলী। কিশোর বয়সে তীব্র সুখ অথবা কষ্ট থাকে না। থাকে বিস্ময়। সে তাকাল কাচের জানালার ওপারে।
জানালার ওপাশে একটি লেক। লেকের নাম এরহাই (Erhai Lake)। চারপাশে সবুজ গাছপালা দিয়ে ঘেরা। গাছের ডাল নুয়ে পড়ছে ফুলের ভারে। লেকের জলে নীল আকাশের ছায়া। এপ্রিল মাস। বসন্তের শেষ নিশ্বাস। গ্রীষ্মের শুরু। উষ্ণ রোদ। নরম সবুজ পাতা। ফুলের রঙ আকর্ষণীয়। নির্মল নীল আকাশ। প্রাণবন্ত প্রকৃতির উদ্দীপ্ত রূপ।
ডালিকে বলা হয় চিরবসন্তের শহর। আরামদায়ক আবহাওয়ার জন্য চীনের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। ঢালি শহরের পশ্চিমে চাংশান পর্বতমালা। প্রায় উনিশটা চূড়া রয়েছে যাদের গড় উচ্চতা চার হাজার মিটার। চূড়াগুলো ঢেকে আছে তুষারে। জানালার পাশে মিঠা পানির এরহাই লেক। তাতে আকাশের নীল প্রতিবিম্ব। লেকের ধারে থোকা থোকা ফুলে নুয়ে পড়া সবুজ গাছের সারি। অতিদূরে চাংশান পর্বতের চূড়া হাসছে। মাথায় তার তুষারের মুকুট। জিং জিং তাকিয়ে আছে লেকের জলে। যেখানে নীল আকাশ ও চাংশান পর্বতের ছায়া মিলিয়ে যাচ্ছে।
দুই হাজার ছাব্বিশ সাল। ফেব্রুয়ারি মাস। উত্তর থাইল্যান্ডের পাই শহর। শীত এখনো বিদায় নেয়নি। কিন্তু তীব্রতা কমে গেছে। কুয়াশা মাখা সকাল। আমি খং নদীর পাড়ে বসে আছি। ঘুম এখনো কাটেনি। ওপাড়ে একটা শূন্য মাঠ। মাঠের এককোণে সরিষার মতো হলুদ ফুল। নদীর পাড়ে কয়েকটি কমলালেবু গাছ। তাতে চীনা আকৃতির কমলা। হালকা হলদেটে। নিচে ঘাসের উপর পাকা কমলা ঝরে পড়েছে। শিশিরস্নাত সেই কমলাগুলোকে স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে।
নদীটার তলদেশ পাথর দিয়ে ভরা। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে পানি বয়ে যাচ্ছে। তিরতির করে। আমি তাকিয়ে আছি দূরে মে হং সন পাহাড় শ্রেণীর দিকে। সকালের সোনালী আলোয় পাহাড়চূড়াগুলো মায়াবী দেখাচ্ছে। নিচে ঘন গাছের সারি। কুয়াশা দিয়ে মাখা।
জিং জিং আসলো তার ছেলেকে নিয়ে। নদীর ওপার থেকে। পাথর টপকে। তারা দুইজন আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমি বসা থাকা অবস্থায় বললাম, গুডমর্নিং।
জিং জিং আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, হ্যালো ম্যান! তুমি কোথা থেকে এসেছ?
তার মাথায় মাঙ্কি টুপি। মাল্টিকালার। উলের সুতা। পরনে ঢিলেঢালা ট্রাউজার। পায়ে স্যান্ডেল। ট্রাউজারটা বেশ পুরনো। সকালে নদীপাড়ে হেঁটে তাতে কাদা লাগিয়ে এনেছে। খুব সাধারণ চেহারা। বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। বয়স কত হতে পারে? আটচল্লিশ অথবা পঞ্চাশ।
তাকে বাংলাদেশের প্রাইমারি স্কুল টিচারদের মতো লাগে। কয়েক বছর পরেই রিটায়ার্ড করবে। পাশে তার ছেলে দাঁড়িয়ে। কমলা রঙের জ্যাকেট। মাথায় হালকা চুল। ছোট ছোট চোখ। গোলাগাল মঙ্গোলীয় চেহারা। নাম লিও।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে হাত মেলালাম তার সাথে। বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। সে আমার দিকে দীর্ঘ দৃষ্টি দিল। আমি চোখ সরিয়ে তাকিয়ে রইলাম মে হং সন পাহাড় শ্রেনীর দিকে। সূর্য ধীরে ধীরে পাহাড় শ্রেনীর উপরে উঠে আসলো। কমলা রঙের আলোয় ভরে গেছে মাঠ।
গতকাল রাতেই আমি এখানে এসেছি। একটা কমিউনিটি হোস্টেল। সবাই একটা পরিবারের মতো। সবার কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়। বাজার করা, রান্না করা, পরিস্কার করা।
এখন সন্ধ্যারাত। সবাই আগুনের পাশে গোল হয়ে বসে আছে। মাঝখানে আগুন জ্বলছে। গান করছেন কয়েকজন। ফরাসি মেয়ে এমা, গিটার বাজাচ্ছে মেতিও। জিং জিং একটা ইউকেলেলে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এমার গান শেষ হলে জিং জিং একটা করে গান ধরে। ছোট গান, এক-দেড় মিনিট। বাচ্চাদের রাইমস্ ‘এর মতো। জিঙ্গো বেল জিঙ্গো বেল…
শেষ রাতে আগুন নিভে গেলে সবাই ঘুমাতে চলে গেল। আমি আর জিং জিং কিছুক্ষোণ বসে রইলাম। সে কয়লার দিকে তাকিয়ে বললো, আগুনের সবচেয়ে সুন্দর সময় কোনটা জানো?
আমি বললাম, যখন সবচেয়ে বড় শিখা ওঠে?
সে মাথা নাড়ল। এবং বললো, যখন শিখাটা থাকে না, শুধু তাপটা থাকে। তারপর আমরা দুইজনে আর কোন কথা বলেনি।
আমি জিং জিংকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কী করো?
উত্তরে হাসি দিয়ে বলল, আমি বাচ্চাদেরকে গান শেখাই। কিন্তু আমি এই জন্য টাকা নিই না। ঠিক বোঝা গেল না সে আসলে কী করে। আমি কয়লার মাঝাখানে এক টুকরা কাঠ বসিয়ে দিলাম।
এত দিনে জিং জিং আর আমি ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছি। আমাদের ধুমপান করার অভ্যাস নাই। দুজন মিলে গল্প করে সময় পার করি। বিকেলবেলা নদীর ওপাড়ে বনে যাই শুকনো কাঠ সংগ্রহ গেলাম। প্রায় প্রতিদিনই যাই আমারা। এটা আমার ও জিং জিংয়ের প্রাত্যহিক কাজ এখন। আমি একটা মোটা গাছের ডাল কাধে তুলতেই জিং জিং বললো, এত বড়টা নিও না। আমি বললাম, আগুন বেশি সময় ধরে জ্বলবে। সে হাসল। তারপর বললো, আগুন বেশি সময় ধরে জ্বলবে, আবার তোমার কাধও বেশি সময় ধরে ব্যথা করবে। শেষে আমারা ছোট ছোট ডাল গুলো নিয়ে ফিরে এলাম। সেদিন রাতে আগুন জ্বলেছিল, আর কাধও ব্যথা করেনি।
জিং জিং খুব কাজের মানুষ। হোস্টেলের নানান জিনিস মেরামত করে বেড়ায়। আমি তার সহকারী হয়ে উঠছি দিনে দিনে। একদিন নদীর পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে জিং জিং আমাকে বলল, ম্যান, আমার মা আসবে। পাইতে এবার সে চীনা নববর্ষ পালন করবে। আর আমার মন ভীষণ খারাপ, তাই আমাকে সময় দেওয়ার জন্য আসবে। লিওকে অনেক মিস করে সে।
জিং জিং সকালে নদীর ধারে হাঁটে। দুপুরে লিওকে নিয়ে খেলে। বিকেলে হোস্টেলের ভাঙা ময়লার ঝুড়ি মেরামত করে। সন্ধ্যায় গান করে। প্রথম কয়েকদিন ভেবেছিলাম, সে হয়তো ছুটিতে এসেছে। একদিন শহরে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলাম, তোয়ার ছুটি কবে শেষ হবে? সে হেসে বলল, আমার অফিস নেই। আমি ভেবেছিলাম, সে মজা করছে। জিং জিং আসলে কোনো কাজ করে না। তার কাজ করার দরকার নেই। জিং জিং একজন চীনা ধনকুবের। অত্যন্ত ধনবান। জিং জিং এর ময়লা ট্রাউজার পড়ে নদীর পাড়ে হেটে বেড়ানো দেখে কেউ বলবে, সে চীনা ধনকুবের। জিং জিংয়ের মা আরো বেশি বিত্তবান।
একদিন নদীর ধারে আমরা দুইজন চুপচাপ বসে ছিলাম। জিং জিং হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করলো, বাংলাদেশে নদী আছে? আমি হেসে বললাম, আমাদের দেশে অনেক নদী। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, তাহলে তুমি এখানে এসে নদীর ধারে বসে থাক কেন? এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে ছিল না সেদিন। মানুষ হয়ত নতুন নদী দেখে না, নতুন নদীর পাশে বসে পুরনো নদীর কথা ভাবে।
জিং জিং নতুন একটা স্কুটি কিনেছে। আমাকে নিয়ে শহরে যায়। মাঝে মাঝে আমরা বাজার আনতে যাই। ফেরার পথে জিং জিং স্কুটি থামিয়ে নেমে পড়ল। এক খাবার বিক্রেতা নারী একটা হাতে টানা গাড়ি নিয়ে দাড়িয়ে রইল রাস্তার পাশে। কোন কথা না বলে জিং জিং গাড়িটি ধাক্কা দিয়ে পাহাড়ের ঢালু রাস্তা থেকে তুলে দিলেন। ভ্রমন করতে গিয়ে আমি দেখেছি। অনেক মানুষ অন্যের উপকার করতে ঘোষনা দেয় না। তারা সাহায্য করে, তারপর এমন ভাবে চলে যায়, যেন কিছুই ঘটেনি।
ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি জিং জিংয়ের মা এলেন পাইতে। আমি বার্মা ঘুরে এলাম ততদিনে। এসে দেখলাম হোস্টেল সাজানো লাল ফানুস ও পতাকা দিয়ে। দেয়ালে ঝুলছে লাল কাপড়ের উপর সোনলী সুতার বুননে নানারকম ড্রাগন। কিন্তু হোস্টেল মানুষজন খুব কম। সবাই গেছে শাম্বালাতে।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় জিং জিংয়ের মা চীনা খাবার রান্না করে—ডাম্পলিং, চীনা নুডলস। ময়দা গুলিয়ে হাতে বানানো হয় নুডলস। আমি আর জিং জিং তার সহকারী। খং নদীর পাড়ে পাতাঝরা সন্ধ্যাবেলা। এখন আর আগুন জ্বালানো লাগে না। ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়ছে। বাতাসে বসন্তের সুঘ্রাণ। দূরে পাহাড়ের ভাঁজ থেকে ড্রাম বাজার শব্দ আসছে। জিং জিংয়ের কোলে লিও। পাশে তার মা। আমিও রয়েছি তাদের সাথে। জিং জিং খুব খুশি। আমিও আনন্দিত। কিন্তু আমার আনন্দের কারণ কী? আমি খুব করে চাইছি জিং জিং এর মাকে যেকোন সাহায্য করতে। তার কিছু প্রয়োজন হবে ভেবে আমি রান্না ঘরের এক কোনে দাড়িয়ে থাকি। আজ সন্ধ্যায় তিনি আবার ডাম্পিং বানাচ্ছেন। সাথে রসুনের সস। আমাকে অনেক ক্ষণ দাড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি স্নিগ্ধ ভাবে বললেন, তুমি কোথা থেকে এসেছ?
আমি সুযোগ পেয়ে সাথে সাথে বলে দিলাম, বাংলাদেশে থেকে। তার হাত থেমে গেল। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর উচ্চারণ করলেন, বাংলাদেশ!
চুলায় হালকা আচের আগুন।চারপাশে মায়দা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমি কয়েকটা ময়দা মাখা বাটি নিয়ে বেসিনে চলে গেলাম।
বাটিতে সাবান ঘষতে ঘষতে আমার খুব ইচ্ছা হলো। জিং জিংয়ের মাকে জিজ্ঞেস করতে, মা, সেই বেদনামুখর সময়ের কথা। সেই ঊনিশ’শো একানব্বই সালের কথা। যেদিন তিনি বলেছিলেন, আহারে! গরিব বাংলাদেশি!! সব মরে গেল।
স্কুটিতে করে হোস্টেলে ফিরছিলাম আমরা। চালাচ্ছে জিং জিং। মাথায় তার হেলমেট। তাকে এখন ভিয়েতনামের সেনাদের মতো দেখাচ্ছে।মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে ফিরে বলল, তুমি বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার ধারণা বদলে দিয়েছ। আমি অধৈর্য নিয়ে বললাম, আমি তো কিছুই করিনি।
উত্তরে আবার পিছিনে ফিরে সে বললো, তুমি পাইতে এসেছ। এটাই যথেষ্ট।
← Back to Travel Stories