← Travel StoriesSa Pa, Vietnam · Quiet Journeys

গ্রিন সাপা হোম স্টে, সাপা, ভিয়েতনাম

সাপার পাহাড়ে কাঠের একটি বাড়িতে কয়েকটি দিন। ভাষার দূরত্ব পেরিয়ে হাসি বিনিময়, বারান্দা থেকে মেঘ দেখা আর নীরব আতিথেয়তার স্মৃতি।

Green rice terraces and mountain slopes in Sa Pa
Sa Pa landscape · Photograph by the author, previously published in Ajker Patrika.

ওদের বাড়িতে আমি কিছুদিন দিন ছিলাম। 🇻🇳

উত্তর ভিয়েতনাম। সাপা ‍উপত্যকায় পাহাড়ের ঢালে তাদের ছোট্ট কাঠের বাড়ি। কাছেই হ্যাম রং পাহাড়শ্রেণী (Ham Rong Mountain)। তারপরে মাত্র আঠাশ কিলোমিটার দূরে চীন সীমান্ত। আমাদের ভাষার ব্যবধান অনেক। কিন্তু দুই জোড়া চোখ ছিল কাছাকাছি। হ্যামকে বসে দোল খেতে খেতে প্রায় হাসি বিনিময়। একদিন আমার সব ময়লা কাপড় গুলো লন্ড্রি করে দিল। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছিলো দুপুরে। আমি একটা বই নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। আমার সামনে বাটিতে করে কিছু লটকন জাতীয় ফল রেখে গেল। স্বাদ ঠিক লটকনের মত নয়। ভিন্ন রকম।

পাহাড়গুলো মেঘ থেকে তাদের বাড়িটাকে আড়াল করে রেখেছে। কাঠের বারান্দা থেকে কত কত মৃদু-মন্থর দৃশ্য চোখে ধরা পড়ে। যেন জীবন্ত টেলিভিশন। মেঘ আসে, মেঘ যায়। হালকা শীলত বাতাসের স্পর্শে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। খানিক বাদেই নামে ঝুম বৃষ্টি।

একদিন সন্ধ্যাবেলায় আমি সাপার বাসে উঠে পড়লাম। তখন ছিল মে মাস। চমৎকার এসি বাস। উঠেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়লাম। শেষ রাতে ঘুম ভাঙ্গলো বাসের ঝাকুনিতে।

জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি বাহিরে মেঘে ঢাকা শহর, পাইন গাছের মাথা ঘিরে আছে কুয়াশার মত মেঘ।তখনো আলো ফোঁটেনি। বাস থেকে নেমে অনেক টুকু পথ হেটে আমি আমার হোস্টেলে পৌছে গেলাম। পথে মেঘ কেটে কেটে রাস্তা খুজে এসেছি।

আমার হোস্টেলের নাম গ্রিন সাপা হোস্টেল। পাহাড়ের ঢালে চীন মুখী কাঠের দোতলা বাড়ি। নিচ তলায় রেস্টুরেন্ট আর উপরে থাকার ঘর। সবই কাঠ দিয়ে বানানো। মেঝে, ছাউনি, সিড়ি, পিলার। মোটামোটা গাছের লগ। এই অঞ্চলে অনেক কাঠ সহজলভ্য বোঝাই যাচ্ছে। লম্বা টানা বারান্দা থেকে হ্যাম রং (Ham Rong Mountain) পাহাড়শ্রেণী পর্যন্ত দেখা যায়। সবুজ পাহাড়ের উপর মেঘের উড়াউড়ি। কিছুক্ষণ বাদেই নামে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। আমি একটা মোটা গাছের লগে হেলান দিয়ে মেঘ, পাহাড়, বৃষ্টি আর পাইনের খেলা দেখছি। সবুজ রংটা চোখে আরামের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। পাহাড়ের ঢালে দিগন্ত বিস্তৃত লুকানো জনপদ। পূর্ব এশিয়ার সব চেয়ে বিখ্যাত ধাপযুক্ত ধানক্ষেত। আর পাহাড়ের আড়ালে তাদের আবাস। আকারে খর্বাকৃতির (অনেকটা লাওসের মানুষের মত), পরিস্কার উজ্জ্বল ত্বক, মাথায় হালকা সোনালী চুল। নারীদের কোমড়ে এক টুকরা রঙ্গিন কাপড় দিয়ে জড়ানো থাকে। প্রায় সব নারীরই একটা দাত সোনা দিয়ে বাধানো।

ওদের মতো সুখি মানুষ খুব কমই দেখেছি আমি। অবিরত সুখি জীবন। প্রানোচ্ছ্বল ও আনন্দে ভরপুর। ওর বাব-মা মিলো হোম স্টে টা চালায় বাড়িতে, ফলের গাছে ভরপুর। আর ফুলের সাম্রাজ্যে। ওরা কিন্তু আবার গরিবও নয়। বাড়িতে দুইটা গাড়ি, ছাদে একটা সুইমিং পুল আছে। লম্বা একটা হল রুমের মত ড্রয়িং রুমে দুইটা আদুরে লোমশ কুকুর ঘুরঘুর করে, মানুষের সাথে ভাব জমাতে আসে।

আমি ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে সাপাকে অবগাহন করি। মেঘ, বৃষ্টি, রোদ, পাইনের মাথা এবং চীন সীমান্ত আমাকে খুব কৌতূহল নিয়ে কাছে ডাকে। আমি নিঝুম রাতে সাপার পাহাড়ি রাস্তা ধরে হেঁটে যাই। পাহাড়ের কার্নিশে দাড়িয়ে চীন সীমান্তের দিকে তাকিয়ে থাকি। চীন যেন আমার কাছে রহস্যময় এক দেশ।

আজ মেঘ কেটে চাঁদ উঠেছে। বৃষ্টি জলে ধোয়া চাঁদ। বড় পবিত্র। বিশাল থালার মত ভেসে বেড়াচ্ছে সাপার আকাশে।

চাদের মুখে মাঝে মাঝে মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছে। আবার সরে যাচ্ছে। আমি তার নাটকীয়তার গৌণ সাক্ষী।

চাদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে সাপা উপ্যত্যকা। বৃষ্টি যে শহরকে ধুয়ে দিয়ে গেল, চাদের আলো শহরটাকে আরো রহস্যময় করে তুলেছে। বড় শান্ত শহরটা এখন। আমার চোখে পড়ছে গির্জার ক্রুসের মাথা, পাইন গাছের আবছা ছায়া, Ham Rong পাহাড় শ্রেণী। সমুদ্রে যেভাবে পানি ঢেউ খেলে, সাপা উপত্যকায় চাঁদের আলো ঢেউ খেলছে। ঢেউ ভাঙছে, হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের আড়ালে।

আমি কাঠের লম্বা বারান্দায় দাড়ানো। আমার চোখ শীতল হয়ে যাচ্ছে। আমার মনের রুক্ষ জমিটা বৃষ্টির ফোটার মত জল পেয়ে যেন শীতল হয়ে উঠছে। আমার ক্লান্তি। অতীত গ্লানি উবে যাচ্ছে।

- গ্রিন সাপা হোম স্টে, সাপা, ভিয়েতনাম। 🇻🇳

← Back to Travel Stories

Related stories

A traveler practicing yoga on the rocks beside the sea in Pondicherry
Pondicherry · People & Place

ঊর্ধভী, পন্ডিচেরি উপকূল

পন্ডিচেরির এক ভোরে ঊর্ধভীর সঙ্গে সমুদ্রের পথে হাঁটা। পুরোনো ফরাসি শহর, উপকূলের বাতাস আর কিছু পরিচিত হয়ে ওঠার মুহূর্ত।

Published 6 November 2026 · 4 min read
Read story ↗
Pai · Khong River · Culture & Community

সাম্বালা, ইউটোপিউয়ান জগৎ।

খং নদীর পাড়ে তাঁবু, গান আর নানা দেশ থেকে আসা মানুষ। সাম্বালার দিনগুলোতে প্রকৃতি ও একসঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে এই ভ্রমণলেখা।

Published 6 November 2026 · 6 min read
Read story ↗