← Travel StoriesForest monastery, Thailand · Quiet Journeys

ফরেস্ট মনেস্ট্রি, মংক

পাহাড়ের আড়ালে এক ফরেস্ট মনেস্ট্রিতে নীরবতা, ধ্যান আর প্রতিদিনের কাজ। কথা না বলেও কাছাকাছি আসা যায়—সেই অভিজ্ঞতার দিনলিপি।

আমি ওর নাম জানিনা! শুধু জানতাম ওর বাড়ি দক্ষিণ কোরিয়া। আমরা এক সাথে ছিলাম, প্রতিদিন এক সাথে বসে খাবার খেতাম, মেডিটেশন করতাম, বাগান ঝাড়ু দিতাম। কিন্তু কথা বলা ছিল নিষেধ।

দুই পাহাড়ের মাঝে ছিল ফরেস্ট মনেস্ট্রি। প্রধান সড়ক থেকে প্রায় দুই-তিন কিলো ভিতরে। প্রথমে একটা রাজকীয় গেইট আপনাকে আমন্ত্রণ জানাবে। এই গেইটের ভিতর দিয়ে একবার প্রবেশ করলে শান্তি আপনার হৃদয় ছুঁয়ে যাবে। বিশাল খোলা মাঠ। সবুজ ঘাসে ঢাকা। গাছ-গাছালিতে ভরা ভরা। অচেনা হলুদ ফুল। নানান রঙ্গের বাগান বিলাস। পাহাড়ের গায়ে ঝুলছে অর্কিড। তারই ফাঁকে ফাঁকে কাঠের ছোট কুটির। ছেলে-মেয়ের জন্য আলাদা থাকার ঘর। মেডিটেশন হল। লাইব্রেরি। ডাইনিং হল।

বনের ভিতর ছোট একটা নদী। এঁকে বেঁকে চলে গেছে মনেস্ট্রির ভিতর দিয়ে। নদীর পাড়ে বেঞ্চ পাতা। বসার ব্যবস্থা। বই পড়া যায়। ধ্যান করা যায়। অথবা কিছু না করে শুধু বসে থাকলে দারুণ লাগে।

ফরেস্ট মনেস্ট্রিতে আছে, একটা ছোট ঝর্ণা। পানির ফোয়ারা। দুইটা গুহা, মংকদের বিশ্রামগার, সবজি বাগান। লেক (তাতে বড় বড় মাছ, যেহেতু সবাই নিরামিষভোজী)। মাছ গুলো দিনে দিনে বড় হচ্ছে।

খুব ভোরে আমাদের ক্লাস শুরু হত। ভোর সাড়ে তিনটায়। তারপর মেডিটেশন, ক্লাস, আহার, বাগানে হেঁটে বেড়ানো (এক ধরনের মেডিটেশন)। বিকালে ছিল অবসর। আমি লেকের পাড়ে বসে, বই পড়তাম। ছবিযুক্ত চমৎকার একটা বই আমার হাতে। কমিক বইয়ের মত। ছবি বেশি। লিখা কম। পড়তে আরাম। সুন্দর সুন্দর শব্দ, আর দারুন ইলাসস্ট্রেশন, রঙয়ের ব্যবহার আরো আকর্ষণীয়। এখানে এসে আমি দুইটা বই উপহার হিসেবে পেয়েছি। আমি পড়ছি, সিদ্ধার্থ জোছনা রাতে ঘর ছেড়ে বাহিরে পা দিচ্ছেন। চাঁদের আলো জানালার ফাঁক গলে তার প্রিয় স্ত্রীর মুখে এসে পড়ছে। চাঁদের মতোই তাকে মায়াবি দেখাচ্ছে। পাশে ঘুমিয়ে আছে তার শিশু। সিদ্ধার্থ নিঃশব্দে দরজা খুলে পা বাড়ালেন। সৌন্দর্য এর খোঁজে। কোথায় এই সুন্দরের উৎস? নির্বান, নির্বান ডেকে যায়।

মাছগুলো ভেসে উঠে শেওলা খাচ্ছে। আবার ডুবে যাচ্ছে অগভীর জলে। ওরাও এখানে স্বাধীন, নির্ভিক ও ভাবনাহীন। আমাকে তারা একটুও ভয় পাচ্ছে না। আমি মাছগুলোর চোখ দেখতে পাচ্ছি এখন। ওরা আমার চোখে চোখ রেখে আরাম করে শেওলা খাচ্ছে। কমলা রঙের মাছ। কোনটা ডোরাকাটা, কোনটা কালছে।

সামনের পাহাড়ের চূড়াটি অনেক উচু। আকাশে গিয়ে ঠেকেছে যেন। আমি লেকের পাড়ে, চূড়াটির বিপরীতে বসে আছি। শেষ বিকালের আলো লেগেছে তাতে। পাহাড় চূড়াটি সারা শরীর সবুজ, তাতে লাল লাল ফুল, নাম না জানা অর্কিড ঝুলছে। মাথায় সূর্যের সোনালী আলো মুকুটের মত লাগছে। হাতের বই নামিয়ে রেখে আমি মিলিয়ে যাওয়া বিকাল দেখছি।

আমার দিন যায়, রাত আসে। মংকদের পিতলের ঘন্টায় আমার ঘুম ভাঙ্গে। কিন্তু বারের হিসাব কে রাখে? আমার থাকার ঘরটি নদীর পাড়ে, সারা রাত পানি গড়িয়ে যাওয়ার সুমধুর কলতান। আমাকে আধো জাগরন, আধো আলোড়নে রাখে। আমি খুব ভোরে শিশির মাখা ঘাসে খালি পায়ে হেঁটে যাই। নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে পাখিদের গান শুনি। বিকালের ঝড়া পাতা আমার গায়ে খসে পড়ে।

ধীরে ধীরে আমার ক্ষুধা-তৃষ্ণা কমে আসছে। আমি পাখিদের মত হালকা অনুভব করছি নিজেকে। সামনে ফোয়ারাতে রংধনু হচ্ছে। এমন সুন্দর কিছু দেখলে, কাউকে ডেকে দেখাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমি একা। সৌন্দর্য একা দেখার জিনিস না। অন্তত দুইজন তো লাগে।

আমাকে বলা হল, তোমার কোন অতীত নেই। তোমার ভবিষ্যৎ-ও নেই। এখানে তুমি কারো কথা ভাববে না। কোন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করবে না। গান শুনবে না, চিন্তা করবে না, কোন কিছু গভীর ভাবে দেখবে না। এখানে শুধু তোমার আছে বর্তমান। এখানে যা খুশি কর। যেখানে খুশি যাও। কিন্তু কোথায়ও ঘুমিয়ে পড়বে না। জাগ্রত থাক। তোমার অতীত গ্লানি মুছে দাও, শান্ত হও। শান্ত হও।

আমাকে দেওয়া হলো, সাদা কুর্তি ও পায়জামা। সবারই একই পোশাক। ছেলে-মেয়ে সব আজ একাকার। খুব মিহি নরম একটা কম্বল, একটা বালিশ, দুইটা বই নিয়ে আমাকে আমার কুটির বুঝিয়ে দিল।

আমি নদীর পাড় ধরে হেঁটে পাহাড়ের দিকে চলে এলাম। তারপর পাথর দিয়ে সিড়ি করে দেওয়া হয়েছে। আমি খালি পায়ে অমসৃণ পাথরে পা ফেলে গুহার মুখে চলে এলাম। মাথার উপর পাথর ঝুলছে। মনে হচ্ছে ভেঙ্গে পড়বে এক্ষুনি। জায়গাটা অতি নির্জন। গম্ভীর। পাশে মোমবাতি। ধূপকাঠি। পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য ফোকড়। কয়েকটা বই, নানান অচেনা জিনিস রাখা। আমার কিছুটা ভয় হতে লাগলো। এখানে মংকরা বসে দিনের পর দিন ধ্যান করে। আমি নিজেকে তাদের জায়গায় নিয়ে চিন্তা করতে লাগলাম। কিন্তু পারলাম না। আমি গুহাটির পিছনে না গিয়ে উল্টো পায়ে সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলাম। তারপর লেটুস পাতার একটা বাগান পেরিয়ে আবার নদীর কাছে একটা হলুদ ফুলে ভরা গাছের কাছে এসে দাড়লাম।

এখানে ইন্টারনেট নেই। বাহিরের সাথে যোগাযোগ এর কোন মাধ্যম নেই। আমাদেরকে বলা হল, তোমাদের কোন কিছু দরকার হলে, আমরাই সব করে দিব। এক সাথে আমরা ছিলাম দুইশ জন। সবাই প্রায় ককেশীয়। কিছু চীনা, জাপানিজ আছে। একমাত্র আমি ধূসর। খাবার খেতে গিয়ে প্রায় দেখা হত এক শ্রীলঙ্কান কাপলের সাথে। তারা ছিল তামাটে। এখানে কারো সাথে কারো কথা বলার হেতু নেই। আমার আর কথা বলা হয়নি তাদের সাথে।

আজ আমাদের ফেরার পালা। আমরা শহরে চলে যাব আজ। সবাই ব্যাগ গুছিয়ে নিচে আসলো। পাশেই গাড়ি অপেক্ষা করছে। শহর এখান থেকে আড়াই-তিন ঘন্টার পথ। আমি কুর্তি-পায়জামা বদলে শহুরে পোশাক পরে নিলাম। অন্যদের সাথে এসে রিসেপশনে যোগ দিলাম। তিনি এলেন। প্রধান মংক। তিনি পুরো থাইল্যান্ড মংকদের প্রধান। বিশেষ সম্মানিত ব্যক্তি। আমাদের খোজ-খবর নিলেন। কেমন লাগেছে জানতে চাইলেন।

আমরা সবাই ফ্লোরে পদ্মাসনে বসে আছি। তিনি একটা কাঠের গুড়িতে, উপরে বসে আছেন। তার গায়ে বাসন্তি রঙের মংকদের বিশেষ পোশাক। তার মাথার পিছনে সূর্য ধীরে ধীরে উঠছে। আলোর ছটায় তার চেহারা ভাল করে বোঝা যাচ্ছে না। পুরো হলে নিরবতা। হলুদ সোনালী আলোয় ভরে গেছে। খোলা হলের পাশে অনেক গুলো কাঠ জাতীয় ফুল গাছ। গাছ যত বড়, ফুল তত ছোট। সেখান থেকে টুপ টুপ করে ফুল ঝড়ে পড়ছে সকালের বাতাসে। একে একে আমাদের সবাইকে গলায় পরিয়ে দিলেন, একটা করে পেন্ডেন্ট। মেয়েদের দিলেন হাতে। তাদেরকে গলায় পারানো হল না। তাতে মিনেস্ট্রির নাম লিখা।

আমাকে কাধে হাত দিয়ে বলল, মংক হও।

আমি বললাম, কিন্তু আমি তো ভ্রমনকারী হয়েছি। তিনি ঈষৎ একটা হাসি দিয়ে বললেন, সে একই কথা।

← Back to Travel Stories

Related stories

A traveler practicing yoga on the rocks beside the sea in Pondicherry
Pondicherry · People & Place

ঊর্ধভী, পন্ডিচেরি উপকূল

পন্ডিচেরির এক ভোরে ঊর্ধভীর সঙ্গে সমুদ্রের পথে হাঁটা। পুরোনো ফরাসি শহর, উপকূলের বাতাস আর কিছু পরিচিত হয়ে ওঠার মুহূর্ত।

Published 6 November 2026 · 4 min read
Read story ↗
Pai · Khong River · Culture & Community

সাম্বালা, ইউটোপিউয়ান জগৎ।

খং নদীর পাড়ে তাঁবু, গান আর নানা দেশ থেকে আসা মানুষ। সাম্বালার দিনগুলোতে প্রকৃতি ও একসঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে এই ভ্রমণলেখা।

Published 6 November 2026 · 6 min read
Read story ↗