← Travel StoriesRolep · Sikkim, India · People & Place

ডোমা আর র‍্যাংপো নদী

রোলেপের পাহাড়ি গ্রামে ডোমা ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখা। অর্কিড, সবজি বাগান আর র‍্যাংপো নদীর গর্জনের মধ্যে কাটানো একটি দিন।

পাহাড় বেয়ে বেয়ে উঠে আসলাম।

উচ্চতা কম নয়। নদীটাকে পিছনে ফেলে হেঁটেছি আড়াই-তিন ঘন্টা। ধীরে ধীরে নদীর গর্জন ক্ষীণ হয়ে আসছে। উপরে বাতাসের ঝাপটা বেড়েছে অনেক। তিব্বতীয় প্রেয়ার ফ্ল্যাগ উড়ছে। আমি এসে দাড়ালাম একটা গ্রামের কাছে।

পাহাড়ের কোলে ভুটিয়াদের গ্রাম। সবুজ ক্যানভাসে রঙিন ঘরবাড়ি। সবই কাঠের বাড়ি। উপরে নীল আকাশ। রোলিং স্টোন সবুজ পাহাড়। রঙিন কাঠের বাড়ি। প্রেয়ার ফ্ল্যাগ উড়ছে। পাশেই মনেস্ট্রি। পাঁচ রংয়ের প্রেয়ার ফ্লেগ। নীল, সাদা, লাল, সবুজ, হলুদ। এর মানে আকাশ, বাতাস, আগুন, পানি ও পৃথিবী। তিব্বতীয় বিশ্বাস অনুসারে এই পাঁচটি উপকরণ দিয়ে মহা বিশ্ব সৃষ্টি করা হয়েছে।

গলা শুকিয়ে আসছে। ডিহাইড্রেশনে। এত দূর চলে আসবো জানতাম না। তাই নিচ থেকে পানি নিয়ে আসা হয়নি। আমি উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছিলাম পানির খোঁজে।

মেয়েটি আমাকে বললো, তোমার কিছু লাগবে?

আমি বললাম, পানি, জাস্ট এক বোতল পানি।

মেয়েটি আমাকে উত্তরে বললো, আমার সাথে আসো। সিক্কিমে পানি বিক্রি হয় না। কারণ সিক্কিমে একবার ব্যবহার উপযোগী বোতল ব্যবহার নিষিদ্ধ। তাই তুমি কোথাও পানি কিনতে পারবে না। সব সময় পানি নিজে বহন করা লাগবে।

আমাকে মেয়েটির তার বাড়িতে নিয়ে গেল। সুন্দর একতলা কাঠের বাড়ি। পাহাড়ের ঢালে। উজ্জ্বল হলুদ রং। দূর থেকে চোখে পড়ে। মূল ঘরে প্রবেশের আগে লম্বা বারান্দা। শত শত অর্কিড ঝুলছে।

মেয়েটি আমাকে বললো, অর্কিড সিকিমের রাজ্য ফুল (স্টেইট ফ্লাওয়ার)। তুমি কি জানো? অর্কিড একবার ফুটলে কত মাস থাকে?

আমি শুকনো গলায় ঢোল গিলে বললাম, কত?

মেয়েটি বললো, ছয় মাস। আর অর্কিড বারো মাসে একবার ফোঁটে। আমার নাম ডোমা। ডোমা ভুটিয়া।

ঘর থেকে মেয়েটের বাবা বের হয়ে এলেন। ডোমা বললো, আমার বাবার সাথে পরিচিত হও। আমি বিনয় দেখিয়ে, ভদ্র লোককে বললাম, নমাস্তে।

ভদ্রলোক হাসি দিয়ে, আমার সাথে হাত মেলালেন। আমরা দুইজনে ঘরে গিয়ে বসলাম। একেবারে খাবারের ঘরে। আমি ডাইনিং টেবিলে। ডোমার বাবা, আমার উল্টো পাশে মুখোমুখি চেয়ার টেনে বসলেন। ডোমা আমাদের দুইজনের মাঝামাঝি ফ্রিজারে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে রইল। আমার দিকে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। ডোমার বাবার মুখে কৌতূহল মাখা হাসি। ডোমা পড়ে ছিল একটা ফ্রোরাল ট্রাউজার, ছোট একটা টিশার্ট। তাতে তার নাভি ঢাকা পড়ে নি। ট্রাউজারের বাম পায়ে ধুলো লেগে আছে।

আমার মাঝখানে রাখা হলো এক ঝুড়ি ফল। আপেল, কলা আর কমলা। আমার হাতে ফল কাটার ছুরি। ততক্ষণে আমি প্রেজেন্টেশন দিয়েছি প্রায়। ডোমার বাবাকে মনে হচ্ছে ঢাকা ইউনিভার্সিটি মার্কেটিং এর বড় আজাদ স্যার। ডোমা আমার পারফরম্যান্স দেখছে। দাঁত দিয়ে নখ কাঁটা শুরু করছে সে।

আমি আপেল খেতে খেতে গল্প বলে যাচ্ছি। ডোমার মা নেই। ডোমার বাবার পেশা এখানে আমি লিখতে চাই না। ভদ্রলোক এখন অবসরে। কিন্তু অনেক শক্ত, সামর্থ্যবান।

বাড়িতে ডোমা আর তার বাবা থাকে কেবল। ডোমার ভাই বাবার পেশাকে বেছে নিয়েছে। থাকে অন্য রাজ্যে।

ভদ্রলোক আমাকে বাড়ির ঢালে নদীর পাড়ে নিয়ে গেলেন। সেখানে সারি সারি কমলা গাছ। আমাকে কমলা পেড়ে হাতে দিলেন। বললেন, খেয়ে দেখ মিষ্টি কেমন?

আমি কমলা মুখে দিয়ে বললাম, মিষ্টি আছে।

ভদ্রলোক বললেন, আগে আরো মিষ্টি ছিল। এখন সিকিমের আবহাওয়া আগের মত নেই। সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিশুদ্ধতা হারাচ্ছে, সিকিমের মাটি, বাতাস, পানি।

ডোমা বেরিয়ে এল ঘর থেকে। বাবার প্রস্থান। আমাকে নিয়ে গেল তার সবজি বাগান দেখাতে। একে একে সব দেখালো। বর্ণনা দিলো। বেগুন, ব্রকলি, গাজর, টমেটো, স্ট্রবেরি, ফ্রেন্স বীন। বাগানের চারপাশে এলাচ গাছ।

আমার চোখ গেলো ছোট একটা সরিষা ক্ষেতের দিকে। নদীর বাতাসে সরিষা ফুল দুলছে। পাহাড়ের ঢালে সরিষা ক্ষেত। ফুল এসেছে। বাতাসে দোল খাচ্ছে সরিষা ফুল। আমি আর ডোমা সেখানে দাড়িয়ে ছবি নিলাম। ছবি তুলে দেওয়ার কেউ ছিল না। ক্যামেরা ট্রাইপডে রেখে, টাইমার দিয়ে ছবি তুলেছি আমরা।

ডোমা একবার বললো, আমি ভালো জামা পড়ে আসি?

তোমাকে এমনিতেই মিষ্টি লাগছে, বললাম আমি। সে তার পাতলা ঠোট নাড়িয়ে হাসি দিলো। অতি ফর্সা তুষারের মত চেহারা। তাতে লাল লাল ছোপ ছোপ আভা। মাথায় হালকা চুল। কোরিয়ার মেয়েদের মত সমান করে কাটা।

পিছিনে মনেস্ট্রিতে ঘন্টা বাজছে। বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে সে ধ্বনি। বিকাল নেমে যাচ্ছে দ্রুত। সময় বয়ে যাচ্ছে তার ও আগে। পাহাড়ে সন্ধ্যা হয় হঠাৎ করে। সূর্য পাহাড়ের আড়ালে চলে গেলেই অন্ধকার। আমি ডোমার বাগানে দাড়িয়ে আছি। পাশে ডোমা। পিছিনে মনেস্ট্রি। সামনে র‍্যাংপো নদী। আমার হোম স্টে এখান থেকে অনেক দূরে। দুই-তিন ঘন্টার পথ। ডাউন হিল।

নদীর ওপাড়ে একটা গাছে লাল ফুলে ছেয়ে গেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই ফুলগুলির নাম কি, ডোমা।

সে বললো, লালুপাতা।

পাহাড়ের উপরে সাদা মেঘ। শীত নেমে গেছে। আমি জড়িয়ে যাওয়া পায়ে নিচে নামছি। ক্রমেই নদীর গর্জন বাড়ছে। পিছনে মনেস্ট্রি। ডোমা তার পাশেই দাড়িয়ে ছিল। বাতাসে অনেক গুলো প্রেয়ার ফ্ল্যাগ উড়ছে। আমি আর পিছনে তাকানোর সাহস পেলাম না। ফিরে আসার সময় ডোমার বাবাকে আর দেখিনি।

সামনে পেলে সাহস করে বলে ফেলতাম। স্যার, আপনার অর্কিড ফুল, কমলালেবু গাছ, ফ্রেন্সবীনের যত্ন আমি নিব। এখানে আমি ফুল ফোটাব। বিনিময়ে কিছুই চাই না। সারা জীবন এখানে মনেস্ট্রির পাশেই কাটিয়ে দিতে চাই।

লম্বা একটা সাসপেনশন ব্রীজ পার হয়ে নদীর ওপারে আমার থাকার ব্যবস্থা। আমি সাসপেনশন ব্রীজের উপরে দাড়িয়ে দেখলাম। ভয়ংকর, ধ্বংসলীলা চলছে নিচে। বারবার মনে হল র‍্যাংপো নদী আমার বুকের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে আজ রাতে। আজ আমি রোলেপ উপত্যকায়, র‍্যাংপ নদীর পাশে ঘুমাব কি করে!

← Back to Travel Stories

Related stories

A traveler practicing yoga on the rocks beside the sea in Pondicherry
Pondicherry · People & Place

ঊর্ধভী, পন্ডিচেরি উপকূল

পন্ডিচেরির এক ভোরে ঊর্ধভীর সঙ্গে সমুদ্রের পথে হাঁটা। পুরোনো ফরাসি শহর, উপকূলের বাতাস আর কিছু পরিচিত হয়ে ওঠার মুহূর্ত।

Published 6 November 2026 · 4 min read
Read story ↗
Pai · Khong River · Culture & Community

সাম্বালা, ইউটোপিউয়ান জগৎ।

খং নদীর পাড়ে তাঁবু, গান আর নানা দেশ থেকে আসা মানুষ। সাম্বালার দিনগুলোতে প্রকৃতি ও একসঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে এই ভ্রমণলেখা।

Published 6 November 2026 · 6 min read
Read story ↗