← Travel StoriesCebu, Philippines · People & Connection

আমার মা তোমাকে অনেক পছন্দ করবে, ডেবি বলল।

সিবুর এক হোস্টেলে ডেবির সঙ্গে আলাপ। একসঙ্গে খাবার খেতে খেতে উগান্ডার এক গ্রাম, মায়ের আদর আর মানুষের আপন হয়ে ওঠার গল্প।

আমার মা তোমাকে অনেক পছন্দ করবে, ডেবি বলল।

আমি বললাম, আমাকে কেন?

আমার সব বন্ধুদেরকে আমার মা নিজের সন্তানের মতো দেখে। তার কাছে পৃথিবীর সবাই আপন। সবাইকে তিনি ভালোবাসেন, ডেবি বলল।

আমি জানি না ডেবির গ্রামটি ঠিক কেমন দেখতে। তবুও আমার চোখে ভেসে উঠল পূর্ব আফ্রিকার একটা গ্রাম। রাজধানী কাম্পালা থেকে অনেক দূরে। লাল মাটির রাস্তা। কাঁকর বিছানো। দুই পাশে ভুট্টা ক্ষেত। কলা বাগান। মিষ্টি আলু। উঁচু নিচু ঢেউ খেলানো প্রান্তর। তারই মাঝে ছোট গ্রাম। ঘর বলতে গম্বুজ আকৃতির মাটির কটেজ। অমসৃণ মাটির দেয়াল। শনের ছাউনি। তাতে বিছানা পেতে ঘুমায় সাত-আটজন। পাশে রান্না করার চুলা। ভুট্টা সিদ্ধ হচ্ছে তাতে। কাসাভা।

​কয়েকটি মুরগি খাবার খুটে খুটে খাচ্ছে। ছাগল পাশের স্বল্প পাতার শূন্য গাছে উঠে বসে আছে। ডেবির ভাইবোন ছয় জন। সবাই তার থেকে ছোট। লালমাটির উপর মাদুরে শুয়ে আছে দুই-তিন জন। শরীরের অর্ধেক আবার বাহিরে।

​বিকালে যখন বৃষ্টি নামে লাল মাটির গন্ধে পুরো গ্রাম ভরে যায়। কলাবাগানের ওপাশে গরুর ঘণ্টা শোনা যায়। তারপর সন্ধ্যা নামলে সবাই আগুন জ্বালিয়ে রান্না করে। গ্রামগুলিতে বিদ্যুৎ নেই। রাতে কোটি তারার নিচে আদিম জনবসতি। কুটিরগুলো থেকে আসছে হালকা লাল আলো। রান্নার চুলা, অথবা লণ্ঠনের আলো। দূরে সাভানাতে হায়নাদের ডাক। আগুনের চারপাশে সবাই গল্প করছে।

​ডেবির সাথে আমার পরিচয় সিবুতে। একটা হোস্টেলে। পিঠে একটা বড় ব্যাগ নিয়ে ডেবি আসল সন্ধ্যার কিছু আগে। আমি কিচেনে রান্না করছিলাম। আমাদের হোস্ট প্রথমে পরিচয় করিয়ে দিল। সে হাত নাড়িয়ে লম্বা করে হাই দিল।

খুব উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত মেয়ে ডেবি। লম্বা। বেশ শুকনা। মাথার চুল ব্রেইড করা। হাসি দিলে তার খুব উজ্জ্বল দাঁত চোখে পড়ে। পরনে ডেনিমের শর্টস। আর স্লিভলেস টপস। তা দিয়ে তার নাভি ঢাকা পড়েনি। নাভিতে পিয়ার্সিং করানো। ঝুলছে একটা রিং। রিং এর উপর বসানো পাথর ডায়মন্ডের মতো ঝলঝল করছে।

তাকে বললাম, তোমার কি ক্ষুধা লেগেছে? খাবে আমার সাথে আসো।

সে বলল, অনেক ক্ষুধা লেগেছে। সরাসরি কুয়ালালামপুর থেকে এসেছি। মাঝে সিঙ্গাপুরে লে ওভার ছিল। আমি কিচ্ছু খাইনি। আমি আর ডেবি টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছি। ভাত, ঢ্যাঁড়শ ভাজি আর মুরগির মাংস। আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। সে উগান্ডা থেকে। অথচ এই মাঝরাতে ফিলিপাইনের এক হোস্টেলে বসে আমরা একই রকম ক্ষুধা, একই রকম ক্লান্তি আর একই রকম স্বপ্ন নিয়ে কথা বলছি।

​রাত সাড়ে বারোটা। হোস্টেলের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। বাহিরে শান্ত শহর। ওসমিনা পাহাড়শ্রেণি ঘুমিয়ে থাকা সিবুকে পাহারা দিচ্ছে। অভয় দিচ্ছে ঘুমাও বাচ্চা আমার। আমার আদুরে মেয়ে, সিবু। সিবু প্রণালীতে পিয়ার থেকে ছুটে যাচ্ছে ফেরি।

গেটের বাহিরে নিচে দুইটা কুকুর ঝিমাচ্ছে। ডেবি এসে আমার পাশে বসল। প্রতিদিন এখানে বসে আমি কাজ করি। তারপর শেষ রাতে ঘুমাতে যাই।

আমাকে একটা ফেভার করবে? ডেবি বলল। কণ্ঠে তার বিনয়। আমি ম্যাক থেকে চোখ সরিয়ে খুব মিষ্টি করে তার দিকে তাকালাম।

ডেবি বলল, আমার সাথে সেভেন-ইলেভেন যাবে? আমার সিগারেট শেষ। সেভেন-ইলেভেন কত দূর এখান থেকে?

আমি বললাম, চল যাই। পাশেই তো। চার পাঁচ মিনিট লাগবে।

গেট খুলে বাহিরে চলে আসলাম। কুকুরগুলো উঠে দাঁড়াল। কিন্তু কিছু বলল না। তারপর আবার আরাম করে শুয়ে পড়ল। পোষা কুকুর এরা। কালো অ্যাসফাল্টের রাস্তা। দুই পাশে এক তলা দোতলা বাড়ি। নিচু প্রাচীর। ফুল নুয়ে পড়ছে পথে পথে। কালো পিচের উপর নাম না জানা ফুল লুটিয়ে পড়ে আছে। পাশে একটা মালবেরির ঝোপ। লাল, কালো আঙুলের মতো মালবেরি ঝুলছে। থোকায় থোকায়। গাছের নিচে পড়ে গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়েছে গুটি কয়েক। আমরা টপকে তা পেরিয়ে চলে এলাম।

পথে অন্ধকার বেশি নয়। শহরটা বেশ খোলামেলা। আকাশ দেখা যায়। রাতের ধূসর ছাইরঙা আকাশের দিকে আমি মাথা উঁচু করে তাকালাম। শহরের অদূরে ওসমিনা পাহাড়শ্রেণি দাঁড়িয়ে আছে। আকাশের নিচে তার কালো ছায়া আবছা আবছা দেখা যায়। গলির মোড় পেরিয়ে আমরা বড় রাস্তায় উঠে আসলাম। মোড়ে কয়েকটি ছেলে মেয়ে পান করছে। সিবুর খুব সাধারণ দৃশ্য। পাশেই ম্যাংগো অ্যাভিনিউ।

আমরা তাদেরকে পেরিয়ে সেভেন-ইলেভেনের সামনে চলে আসলাম।

ডেবি এক প্যাকেট সিগারেট নিল প্রথমে। চেস্টারফিল্ড।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, লাইটার?

বলল, আমার কাছে আছে।

আমি বললাম, আমার জন্য অপেক্ষা করো, আমি বিয়ার নিয়ে আসি।

আমি চিলার খুলে দুই বোতল বিয়ার তুলে নিলাম। স্যান মিগ। ১৮৯০ সালের কোম্পানি। স্প্যানিশরা শুরু করেছিলেন ব্রিউইং। আজো একই ভাবে একই বোতলে বাজারজাতকরণ করে আসছে। বোতলটা দারুণ সুন্দর। ভিন্টেজ। বোতলের লেখাগুলি মিনিমালিস্ট। এক রঙা।

আমরা হাঁটছি এলোমেলো ভাবে। পায়ে স্লিপার। আমার সাইজটা একটু বড়। ডেবি আসার পর আমার স্লিপার দখল করেছে। আমি হাঁটছি টেনে টেনে। হাতে বিয়ারের বোতল। মুখ খোলা। রাস্তাটার এই দিকে খুব নির্জন। গাড়ি নেই। কোনো শব্দ নেই। দিনের বেলায় এই রাস্তায় দুই একটা গাড়ি যেতে দেখা যায়। কিন্তু এখন মধ্যরাতে একেবারে ফাঁকা। আমি আত্মবিশ্বাসী। এই শহর নিরাপদ। বাম পাশে একটা ভাঙা বাড়ি। লতাপাতায় ঘেরা। আধুনিক একটা শহরে এমন বাড়ি থাকাটা বেমানান। সেদিন অ্যানা (হোস্টেল ম্যানেজার) বলেছিল, ওই দিকে তুমি রাতে যেও না। ওখানে কয়েক বছর আগে একটা মেয়ের লাশ পাওয়া গেছে। কেউ জানে না, লাশটি কোথায় থেকে এসেছে।

​আমরা ঘুরে আবার হোস্টেলে চলে আসলাম। চাবি সবার কাছেই থাকে। যখন খুশি বের হওয়া যায়। আবার হোস্টেলে প্রবেশও করা যায়। অবাধ স্বাধীনতা। আমরা এসে ডিভানে হেলান দিয়ে বসলাম। মাথার নিচে কুশন দিয়ে আমি শুয়ে পড়লাম। ডেবি আমার পায়ের কাছে বসে সিগারেট খাচ্ছে। সিগারেটের গন্ধটা আমার মোটেও খারাপ লাগছে না। আমার আরাম আরাম লাগছে।

ডেবি আমার পা ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করল, ম্যাগস, ডু ইউ হ্যাভ ইস্যুস উইথ ব্ল্যাক গার্ল?

আমি বললাম, কালো তো একটা রং। নো বিগ ডিফারেন্স। আসল কথা তোমার ভিতরে কি আছে?

ডেবি বলল, তোমার উত্তর আমার পছন্দ হয়েছে।

​ডেবি বেড়ে উঠেছে পূর্ব আফ্রিকার দেশ উগান্ডাতে। সাভানা, বনাঞ্চল, ভিক্টোরিয়া লেক উগান্ডার প্রকৃতিকে বিশেষ রূপ দিয়েছে। বিস্তৃত প্রান্তর। কিছুটা উঁচু নিচু। ঢেউ খেলানো। সকালের কুয়াশা সরে যেতেই ধীরে ধীরে হেঁটে বেড়াচ্ছে একদল জিরাফ। বিচরণ করছে গন্ডার। শনের বনে লুকিয়ে আছে সিংহ। হরিণের পাল ঘাস খাচ্ছে, আর পাছে পাছে শিকারির উপর নজর রাখছে। পাশের ডোবায় হাঁ করে রোদ পোহাচ্ছে কুমির। আরো বহুদূরে বৃষ্টিবনের অন্ধকারে বাস করছে পৃথিবীর শেষ কয়েকটি মাউন্টেন গরিলা।

​জীবন এখানে আদিম। সমান্তরাল। প্রকৃতি এখানে প্রধান নিয়ামক। ভারসাম্য মেনে চলে। শিকারি ও শিকারের মধ্যে চলে আদিম প্রতিযোগিতা। প্রতিটা দিন সুযোগ। উপভোগ করো। বেঁচে থাকো। অন্যথায় শিকারির থাবায় প্রাণ দাও।

​আফ্রিকা মানুষের প্রথম ঠিকানা। মানুষের জন্মভূমি! কোনো এক নদীর তীরে, কোনো এক বাবলা গাছের ছায়ায়, পূর্ব আফ্রিকার কোনো এক সাভানায় কোনো নারী পুরুষ একে অপরের হাত ধরেছিল। এখানে মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখেছে। গল্প বলা শুরু করেছিল। এই পূর্ব আফ্রিকার কোনো স্থানে মানুষেরা ভালোবেসে সংসার শুরু করেছিল। হাজার হাজার বছর আগে। উষ্ণমণ্ডলীয় বন, সাভানা, মরুভূমি, পর্বত এবং ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু। আমাদের পূর্বপুরুষের রক্তে, ঘামে আফ্রিকার মাটি হয়েছে লাল। প্রকৃতির সাথে অবিরাম সংগ্রাম করে নিজের পরিবারকে রক্ষা করেছে। কৃষিকাজ, সন্তান জন্মদান, ভাষার বিকাশ ঘটছে এই আফ্রিকায়। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের রক্তে আজো আফ্রিকার স্মৃতি বহন করে চলেছে।

​সারাদিন শিকার করেছে। বনে গিয়ে ফল মূল সংগ্রহ করেছে। কোনো লেকে, নদীতে গিয়ে গোসল করেছে তারা। তারপর সন্ধ্যায় আগুন জ্বালিয়ে মাংস পুড়িয়ে খেয়েছেন তারা। আগুনের পাশে গোল হয়ে বসে রাতের খাবার খেতে খেতে আবিষ্কার হয়েছে ভাষার। জন্মেছে গল্প বলার মতো দারুণ আবেগী ব্যাপার। পরের দিনের পরিকল্পনা। যুদ্ধ প্রস্তুতি।

বহু শতাব্দী ধরে চলেছে এই যুদ্ধ। হোমো স্যাপিয়েন্স আর নিয়ান্ডারথালদের মধ্যে সেই ভয়াবহ যুদ্ধ। আরো একটু উত্তরে যেখানে আফ্রিকা ইউরোপের দেখা পেয়েছে।

​ডেবির বয়স সাতাশ। পেশায় একজন ইংরেজি শিক্ষক। উগান্ডাতে তার পরিবার ছেড়ে এসেছে দুই বছর আগে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়াতে পার্ট টাইম ইংরেজি পড়ায়। ভলান্টারি কাজ করে। তার একটা ওয়েবসাইটও আছে।

আমাকে বলল, তুমি আমার কাছে ইংরেজি শেখো।

আমি বললাম, ডেবি, আমার স্কোর সাড়ে সাত। নয়ের মধ্যে।

সে বলল তাতে কী, তোমার উচ্চারণটা নেটিভদের মতো না।

আমি হেসে বললাম, আমি কিন্তু টাকা দিতে পারব না।

সে বলল, আমাকে তাহলে cigarette কিনে দিও।

​মৃদু গান হচ্ছে, আই কান্ট স্টপ ফলিং ইন লাভ উইথ ইউ। ঘরের আলো কমানো। ডাইনিং টেবিলের পাশে একটা আলো জ্বলছে কেবল। বাকি ঘরে অন্ধকার। ডেবি নিঃসংকোচ। সামাজিক আড়ষ্টতা নেই। আমি ডেবিকে দেখছি না কেবল। পুরো এক মহাদেশ দেখছি। বিস্তৃত সাভানা, লাল মাটির পথ, ভিক্টোরিয়া লেকের পাড়ে প্রাচীন বন। তাতে লুকানো সোনা। অজানা রহস্য, ভয় আর শিহরণ। ডেবি সেই আদিম মানবী। লিলিথ। cigarette শেষ করে পা ছড়িয়ে দিয়েছে আমার কোলের কাছে।

কোনো একদিন সত্যিই আমি উগান্ডার সেই লাল মাটির ডেবির গ্রামে যাব।

ডেবির মা আমাকে দেখে বলবেন, এসো, খেয়ে নাও। পৃথিবীর সব মায়ের ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু আদর করার ভাষাটা বোধহয় একই।

← Back to Travel Stories

Related stories

A traveler practicing yoga on the rocks beside the sea in Pondicherry
Pondicherry · People & Place

ঊর্ধভী, পন্ডিচেরি উপকূল

পন্ডিচেরির এক ভোরে ঊর্ধভীর সঙ্গে সমুদ্রের পথে হাঁটা। পুরোনো ফরাসি শহর, উপকূলের বাতাস আর কিছু পরিচিত হয়ে ওঠার মুহূর্ত।

Published 6 November 2026 · 4 min read
Read story ↗
Pai · Khong River · Culture & Community

সাম্বালা, ইউটোপিউয়ান জগৎ।

খং নদীর পাড়ে তাঁবু, গান আর নানা দেশ থেকে আসা মানুষ। সাম্বালার দিনগুলোতে প্রকৃতি ও একসঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে এই ভ্রমণলেখা।

Published 6 November 2026 · 6 min read
Read story ↗