দালাত, দক্ষিণ ভিয়েতনাম
দালাতের লেকপাড়ে অচেনা এক মুখ, পাহাড়ের ঢালে হোস্টেলের দিনরাত্রি আর পথে পড়ে থাকা একটি ফুল—কিছু সময়ের সান্নিধ্য কীভাবে মনে থেকে যায়।
এক
একটা লেকের ধারে ঘাসের উপর শুয়েছিলাম আমি।
নরম ঘাস। কার্পেটের মতো মোলায়েম। সবুজ ঘাসের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে হলুদ, সাদা ফুল। সিঙ্গাপুরিয়ান ডেইজি। আমার পা লেকের দিকে। ঢালুতে। মাথা তুলনামূলক উপরের দিকে। বেশ আরাম লাগছে এখন। পিঠের নিচে নরম ঘাস তোষকের মতো পুরু। লেকের ওপাড়ে একটা বনের ছায়া। গাছ গুলোর কি নাম! এত লম্বা, এত সবুজ আর বড় বড় তার পাতা। যেন আকাশ আড়াল করে রেখেছে। দূরের পাহাড় শ্রেণী আমার দৃষ্টিসীমার মধ্যে।
পাহাড়ের উপরে কয়েক টুকরো সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। সাদা সাদা মেঘ। কটন ক্যান্ডির মতো হাল্কা। পাহাড়ের উপরে, আকাশের নিচে টারবাইন ধীরে ধীরে ঘুরছে। আমি মাথার নিচে দুহাত দিয়ে শুয়ে আছি। লেকের বাতাস আমার শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছে। বাতাসে ঘাস ফুলের সুভাস। আমার চোখ বন্ধ করে ফেলতে ইচ্ছে করছে। পাশে ক্যামেরা, সান ক্যাপের ভিতর মোবাইল ফোন। জানি চুরি হবার ভয় নেই। ধীরে ধীরে আমার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে।
লেকের বাতাস, ফুলের সুবাস, বনের উপরে পাহাড়ের শ্রেণী, তার উপরে মেঘেদের উড়াউড়ি। আমার তন্দ্রার মত লাoগছে। আরামে চোখ বুঁজে আসছে। কিন্তু আমি ঘুমিয়ে পড়তে চাই না।
আমি কাত হয়ে শুলাম। হলুদ একটা ফুল আমার গালের কাছে আলতো করে ছুয়ে ছুয়ে দিচ্ছে। আমি নরম ঘাসে হাত বুলিয়ে দিলাম।
সে আসলে নিঃশব্দে। ব্যাগ নামিয়ে আমার কিছুটা দূরে বসে পড়ল। কালো ফ্লোরাল স্কার্ট, সাদা টিশার্ট। আর উপরে নীল রঙ্গের সুয়েটার। বোতাম খোলা। হালকা লালচে চুল। প্রকৃতি যেখানে অবিরত, আকুন্ঠ, অবিরাম। আমাদের দূরে থাকাটা বেমানান। প্রকৃতি আমাদেরকে নিজের ভিতর টেনে নিল। লেক, স্বচ্ছ জল, বনের ছায়া, পাহাড়া চুড়া, সাদা মেঘের দল, টারবাইন, ডেইজি ফুল, নরম ঘাস, আমি ও সে।
আধাঘন্টা বাদে আমরা দুইজনেই হাটছি। পাশাপাশি লেকের ধার ধরে। ঘাস মাড়িয়ে। হাটায় আমাদের ভীষণ হেয়ালি। যেন আমাদের কোন গন্তব্য নেই। একটা বাগান পেরিয়ে ওপর পাশে চলে এলাম। অন্যরা আমাকে উৎসুক ভাবে দেখল। দুই একজন হাত নাড়িয়ে গ্রিট করলো। যেন আমি জিতে নিয়েছি কিছু। অপরিচিত আগুন্তকের রাজকন্য জয়।
পিছনে ভিয়েতনামের সোনালী তারা আর রক্ত লাল পতাকা। পতপত করে উড়ছে। পাশে কয়েকটি কিশোর ঘুরি উড়াচ্ছে। ভিয়েতনামে আমি যত সুন্দর দৃশ্য দেখেছি, তার মধ্যে অন্যতম তাদের পতাকার পতপত করে উড়ে বেড়ানো। যেন এক গৌরব বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে। বড় পবিত্র অনুভূতি এনে দেয়। আজানা কারনে ভীষণ সাহসী লাগে। শিরায় রক্তের বেগ অনুভূত হয়।
আমরা তারই নিচে বসে পড়লাম। পিছনে একটা অডিটোরিয়াম। সিড়ি নিচে নেমে গেছে রাস্তা পর্যন্ত। সিড়িতে দাড়িয়ে ছবি নিলাম আমরা। সে আমার পাশে ঘেসে দাড়াল। হাত রাখল আমার পিঠে। আমি শিহরণ অনুভব করলাম। সে যেন রূপকথার দেশ থেকে এসেছে। স্নিগ্ধ। মায়াবী। আর মাধুর্যভরা মুখ। আর বার বার আমার দৃষ্টি যাচ্ছে তার কালো ফ্লোরাল স্কাটে। যেন সে ঘাস ফুলের বন কোমড়ে জড়িয়ে হাটছে। স্কাটে ফুল গুলি হাসছে। বাতাসে দুলছে।
হেটে হেটে আমি আমার হোস্টেলে চলে এলাম। আমার হোস্টেলটা শহরের অন্যপাশে। যেদিকে লেক তার উল্টা দিকে। আট-দশ মিনিটের হাঁটা পথ। হোস্টেলের পথে একটা বন পড়ে। তারই ভিতর দিয়ে রাস্তা। পথে নাম না জানা, অচেনা ফুল পড়ে আছে। আমি অচেনা সেই ফুলের একটা পাপড়ি হাতে নিয়ে নিলাম। কিছুক্ষণ দেখলাম। তারপর আলতো করে রাস্তার পাশে রেখে দিলাম। যেন ফুলের অবজ্ঞা না হয়। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা নিয়ে স্বযত্নে রেখে হাটা দিলা। পিছিনে তাকালাম না। যেভাবে আমি লিনকে (Linh) রেখে আসলাম লেকের পাড়ে। আমি ক্ষনিকের অতিথি এখানে। আমার কি সাধ্য কাউকে আপন করার! লিন আমার কাছে অচেনা ফুল। তার সৌরভ আমাকে মোহিত করেছে। লিন আমার পৃথিবী স্থবির করে দিয়েছে কিছু সময়ের জন্য। থমকে থাকা সময়ে আমি লিনের কাছে ছিলাম। গাছ গুলো অনেক লম্বা। মনে হয় আকাশে গিয়ে ঠেকেছে। ফুলটা রাস্তার পাশে রয়ে গেল। হাটতে হাটতে হোস্টেলে ফিরে এলো আমার শরীর। মনটা ফুলের কাছে রয়ে গেল।
দুই
হোস্টেলের নাম টাইগন দালাত। দক্ষিণ ভিয়েতনামের দালাত শহর। পাহাড়ের ঢালে তিনতলা বাড়ি। ছাদে লাল ইটের টালি। সবুজের মাঝখানে লাল রঙ্গের বাড়িটিকে চোখে লাগে। বিকালের পর শীত নামতে শুরু করেছে। আমি হোস্টেলের বারান্দায় লম্বা একটা বেঞ্চে বসে আছি। দৃষ্টি বাইরের দিকে। টারবাইন ঘুরছে। সাথে সাদা সাধা মেঘ উড়ছে বাতাসে। নিচে ঢেউ খেলানো সবুজ পাহাড়। বিকালের আলো পাহাড়ের উপর সোনালী রং ছড়িয়ে দিয়েছে।
আমার পাশে একটি ফরাসী মেয়ে বসে আছে। টি শার্টের উপর সাদা সোয়েটার পরা। হাতে তার সিগারেট। বাম হাতে তার সোনালী রঙ্গের ঘড়ি। সিগারেটের ও পারফিউমের মিলেমিশে সুন্দর একটা মিষ্টি সুগন্ধ তৈরি করেছ এক কোনে। মাথায় তার লম্বা চুল। কোকড়ানো। মেডুসার মতো চুল গুলো কিলবিল করে তার ফর্সা গলা চুয়ে কাধে পর্যন্ত নেমে এসেছে।
আমাকে বললো, আমি আমার দাদীর মতো দেখতে হয়েছি। জানো, ভিয়েতনামে এসে আমার ত্বক মরে যাচ্ছে। নিষ্প্রাণ হয়ে যাচ্ছে। ধরে দেখ। কারণ ভিয়েতনামের পানিতে মিনারেলস নেই।
সে প্যারিসে থাকে। প্যারিসের রাস্তার বর্ণনা, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট, কত নাম্বার বাস কোন রুটে যায় আমাকে তারই বিস্তর বিবরণ দিচ্ছে এই মুহুর্তে। মনে হচ্ছে আগামী সপ্তাহে আমি প্যারিস যাচ্ছি। পরিচিত বন্ধু আমাকে ট্রাভেল আইটিনিয়ারি করে দিচ্ছে। আমার চোখে ভাসছে প্যারিস থেকে বহুদূরে কোন আঙ্গুর ক্ষেত। তারই মাঝে ঢেউ খেলানো প্রাচীন পাথুরে রাস্তা। কল্পনায় আমি বহুবার এপথে সাইকেল চালিয়েছি। যেমনটা আমি A Good Year সিনেমাতে দেখেছি। Mid Night in Paris দেখে আমার শেষ রাতে প্যারিসে বৃষ্টিতে ভিজার প্রবল ইচ্ছা হয়ে ছিল।
আমাদের সামনে সিঙ্গাপুরিয়ান একটা মেয়ে কাঠের টুল টেনে বসে পড়ল। এশিয়ান চেহারা। ছোট চোখ। হালকা চুল।
সামনে তার এক বোল মিক্সড ফ্রুট সালাদ। অ্যাভোকাডো, ড্রাগন, কলা, আপেল, ড্রেসিং দিয়ে মাখানো। সাথে কালো কালো ছোট সরিষার দানার মতো কিছু মেশানো। অল্প সময়ে আমাদের তিনজনের মধ্যে একটা উপশ্রেনী তৈরী হয়ে গেল। আমি আর সিঙ্গাপুরিয়ান মেয়েটি শ্রোতা আর ফরাসী মেয়েটি বলেই যাচ্ছে। পারদ আরো নিচে নামছে। সিগারেট পুড়ছে খুব ধীরে। এর মধ্যে ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে গেল কেউ। মৃদু গান বাঁজছে। পরিচিত সুর, অপরিচিত গান।
তিন
আজ রাতে আমাদের ডিনার এখানে। লম্বা টেবিলের দুইপাশে ছোট ছোট বেঞ্চিতে আমরা বসালাম। প্রথমে খাবারের বাটি, ফর্ক, চপস্টিক দিয়ে গেল। ধীরে ধীরে খাবার আসতে লাগল। ভলান্টিয়ারদের কেউ একজন আমাকে কানে কানে জিজ্ঞেস করল, আমি ভিগান নাকি নন ভিগান? আমি বললাম, ওমনিভোরাস (সর্বভুক)।
আমার যায়গা হলো, সর্বভুকের দলে। আমার সেই প্যারিসের বন্ধুটিকে তুলে নিয়ে ভিগানদের টেবিলে সেট করে দিল। সে নিরামিষভোজী।
বেগুন ভাজা, ডিমের পাতলা অমলেট, আলু-গাজর দিয়ে মুরগির তরকারি, টফু আর ভাত। বিভিন্ন লতা পাতা রোল করে একটা স্পিং রোলের মতো করে বানিয়েছে। আমাদের ভেজিটেবল রোলের মত। এটা দিয়েছে স্টার্টার হিসেবে। আমারা এটা দিয়ে খাবার শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পরেই আমি আরেক বাটি ভাত চেয়ে নিলাম। কেউ খাচ্ছে ফর্ক দিয়ে, কেউ চপস্টিক দিয়ে।
সন্ধ্যার হালকা লালচে আলোয় আমি খেতে খেতে সবার চেহারা দেখছি। কত কত দেশের মানুষ। অন্য মহাদেশ থেকে এসেছেন তারা। ইউরোপীয়, সাউথ আমেরিকান, জাপানি, চীনা, রাশিয়ান, আফ্রিকান ও এশিয়ান।
খাবার শেষে ছোট গ্লাসে আমাদেরকে দেওয়া হলো ড্রিংকস। তাতে ভাসছে এক টুকরা লেবু। আমরা সবাই সমস্বরে বললাম, মো হাই ও!
মেয়েরা নাচতে লাগল। হাতে গ্লাস। কোমর দুলছে তাদের। কণ্ঠে উচ্চ্বাস। আমরা ছেলেরা নাচ শেষে তাদেরকে ক্ল্যাপ দিয়ে বাহবা দিলাম। একটা ককেশীয় মেয়ে আমার কাছে ঘেসে এসে বলল, তুমি নাচ না কেন? হাতে তার গ্লাস। চোখে দুষ্টু হাসি।
রাত বাড়ছে। শীত তীব্র হচ্ছে। যারা কাপল ছিল, তারা ইতিমধ্যে রুমে চলে গেছে। আমি কাঠের সিড়ি বেয়ে উপরে উঠছি। তিন তলায় আমার ডর্ম। সিড়িতে ডান পা দিয়ে বুঝলাম। আমার শরীর আলসে লাগছে। সামান্য টলছি। মসৃণ কাঠের পাদানিতে পা ফেলে ধীরে ধীরে আমি উঠছি। সারা শরীরে আমার ঘুম।
চার
পাহাড়ের ঢালুতে ল্যাভেন্ডার ক্ষেত। সারি সারি ফুল গাছ। মাঝখান দিয়ে হেটে যাওয়ার রাস্তা। পার্পেল রঙ্গের ল্যাভেন্ডার ফুলে ভরে আছে উপাত্যকা। বাতাসে দুলছে ল্যাভেন্ডার ফুল। কিছুটা সুভাস ছড়িয়ে আছে বাতাসে। আমি হেটে হেটে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে এলাম। কয়েকটি ফুলের শাখা আমার ট্রাউজারে এসে লুটিয়ে পড়ল।
আমার সামনে একটা লেক। লেকের পানি ফিরোজা রঙ্গের। ওপাশে পাহাড়। দূরে সবুজ গাচ্ছে আচ্চাদিত ফ্রেন্স টাউন। লেকের পানির সামনে একটা গাছের ছায়ায় আমি বসে পড়লাম। আমার মাথার উপর দুলছে সবুজ রঙ্গের এ্যাভোকাডো। ওপরের গন গনে নীল আকাশ। ল্যাভেন্ডার ক্ষেতের মাঝাখান দিয়ে দুইটি কিশোরী মেয়ে হেটে আসছে। মাথায় বেনী করা চুল। হাটার তালে তালে তাদের বেনী দুলছে।
দালাতকে বলা হয় চির বসন্তের শহর। সমুদ্রে পৃষ্ঠ থেকে পনেরশ মিটার উচ্চাতায় শহরটির অবস্থান। ফরাসী উপনেবেশিক শাসনামলে এটিকে তারা লিটল প্যারিস মতো গড়ে তুলেছিলেন।ভিলা, ক্যাথেড্রাল, বেকারি, কফিশপ রাস্তার দুইপাশে। রেল স্টেশন, হ্রদ ও ফুলের বাগান। আর ঢেউ খেলানো সবুজ পাহাড়। এই সব পাহাড়ের ভাজে ভাজে আছে কফি বীনের বাগান। অ্যাভোকাডো ফলের গাছ। স্টবেরি ও সবজি চাষ। আরো আছে মধু চাষ। পাহাড়ে লুকিয়ে আছে বুনো সব ঝর্ণা। আজ আমি চলে যাচ্ছি যাব। আমার গন্তব্য প্রায় চারশো কিলোমিটার দূরে সাইগন শহরে। ব্যাগ কাধে তুলে নিতে গিয়ে বেশ ভারী মনে হল। দরজার হাতলটা শীতল। হোস্টেলে ম্যানেজার এসে হালকা করে জড়িয়ে ধরেলেন। বললেন, আবার যদি দালাত আসো। এখানে আমাদেরকে দেখতে আসবে। আমার হাতে গুজে দিলেন একটা চিরকুট। পুরোটা কলমের কালিতে লিখা। চারপাশে আকা ডুডল। হোস্টেল ম্যানেজার দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। রিসেপশনের মেয়েটি একটা ছোট হাসি দিল।
রাস্তার বাক ঘুরতে লাল টালির বাড়িটি চোখের আড়াল হয়ে গেল। সেই বন পেরিয়ে যাচ্ছি এখন। পায়ের তলায় কালো পিচের রাস্তা। তাতে পড়ে আছে অচেনা সেই ফুল।
← Back to Travel Stories