বান্দিলান, সিকিহোর
সিকিহোরের পথে তাজা মাছের বাজার থেকে বান্দিলানের পাহাড় ও বনের হোস্টেল। সাগরের রং, জনপদের দিনযাপন আর এক নির্জন বিকালের ভ্রমণকথা।
রাস্তার পাশে মাছ বিক্রি করছেন স্টিভেনসন ও তার স্ত্রী। আমাকে দেখে উৎসুক হয়ে বললেন, স্যার মাছ নিবেন?
আমি পাশে তাকিয়ে দেখলাম, ভারি সুন্দর মাছ। বরফ দেওয়া না। একেবারে তাজা মাছ। মাছের নাম জিজ্ঞেস করলাম আমি। একে একে বলল, প্যারট ফিশ, বাঙ্গুস, ফ্লাইং ফিশ। আরো কয়েকটা নাম বলল। আমার অচেনা সব মাছ। নিডল ফিশ নামে একটা বড় দেখলাম। মুখ করাতের মতো লম্বা। মাছটা মানুষের মতো বড় লম্বায়। সরু। রূপালী শরীর।
স্টিভেনসন মাছটা টেনে টেবিলের এক পাশে রাখলেন। তার পাশে প্যারট ফিশ রয়েছে। গাঢ় নীল। সবুজ। বেগুনি। এত সুন্দর মাছগুলি। সাগরের নীল পানিতে যখন এরা সাঁতার কাটে আজব লাগে। আমি একবার স্নোরকেলিং করে দেখেছি। মাছদের সাথে সাঁতারও কেটেছি। কিছুটা ভয় লেগেছিল প্রথম দিন।
সুলু সাগরের এক প্রান্তে ছোট দ্বীপ। নাম সিকিহোর। আঠারোশ শতকে স্প্যানিশরা এটি আবিষ্কার করেছেন। ফিলিপাইনের মধ্য ভিসায়া অঞ্চলে সুলু সাগরের এক কোণে অবস্থান। এটি একটি প্রাচীন মৃত আগ্নেয়গিরি। বহু শতাব্দী অগ্ন্যুৎপাত হয়নি। দ্বীপের মাঝ বরাবর একটা সিঙ্কহোল আছে। তারপরেও দ্বীপটা অনিন্দ্য সুন্দর। সবুজ গাছপালা দিয়ে মোড়ানো। কোটি বছরের লাভা ঢাকা পড়েছে নরম সবুজ তরুলতায়। ভিতরে জ্বলতে থাকা গলিত আকরিক লোহার কথা ভুলে গেছে সবাই। দ্বীপের চারপাশে নারকেল গাছ। শত-সহস্র। মাঝারি, বামন আকৃতির। গাছের মাথা নারকেল দিয়ে বোঝাই করা। এখানে নারকেলের কদর নাই। নারকেল শুকিয়ে নিচে পড়ছে অনবরত। আবার সেখান থেকে চারা গজাচ্ছে।
সিকিহোরে রয়েছে বান্দিলান নামে একটা পাহাড়চূড়া। উচ্চতা বাইশো ফুটের মতো। ধাপযুক্ত অতি উর্বর ঢালু জমি। ধীরে ধীরে নেমে এসেছে সাগরের দিকে। ঢালু জমিগুলোতে ধান চাষ হয়। আইলে নারকেল গাছ। ভুট্টা খেত। মহিষ ঘুরছে পাশে। সরু নালা দিয়ে পানি সেচের ব্যবস্থা। দূরে কোনো ঝরনা থেকে পানি নালা কেটে আনা হয়েছে। দ্বীপ জুড়ে এগারো-বারোটি ঝরনা। গুহা। একটি ভূগর্ভস্থ নদী রয়েছে। নদীর আবহাওয়া আবার দ্বীপ থেকে ভিন্ন।
আমি ধীরে ধীরে উপরে এলাম। পাহাড়ের কার্নিশ ধরে হাঁটছি। দুপুর শেষ হয়ে বিকেলে পথে সূর্য। আমার পায়ের নিচে সবুজ বন। দ্বীপের প্রান্ত থেকে শুরু অসীম নীলাভ সমুদ্র। সুলু সাগর। আমার দৃষ্টি সুদূর নীলে মিলিয়ে যায়। তারপর আর কিছু দেখা না গেলেও বাকি যা থাকে তা কল্পনা। দ্বীপের মিষ্টি বাতাসে আমার চুল উড়িয়ে দিচ্ছে। হেঁটে আমি ঘেমে উঠেছিলাম। শার্টের আরো দুইটা বোতাম খুলে দিলাম।
হেঁটে হেঁটে আমি আবার নিচে নেমে এলাম। সামনে গভীর বন। আলো কম এখানে। গাছের রং সবুজ নয়, বরং কালো ছায়ার মতো। গাছগুলো অতি উচ্চ। ডাল-পালাহীন। একটা বিশাল খোলা প্রান্তরের পরে বনের শুরু। সবুজ প্রান্তরের পাশ দিয়ে ইটের সরু রাস্তা চলে গেছে। বনের বিপরীতে। প্রান্তরটি শূন্য। বড় গাছ নেই। সবুজ কচি, নরম ঘাস দিয়ে আবৃত। আমি হেঁটে হেঁটে প্রান্তরের একপাশে সরে এলাম। সামনে আমার ঘন-কালো বন। বিকালের অস্ত যাওয়া সূর্য বনের ছায়া ফেলেছে সবুজ প্রান্তরে। মৃদু বাতাসে প্রান্তরের সবুজ ঘাসের আগা দুলছে। বনের ভিতর নির্জনতা। অন্ধকার। আর রহস্য।
এই স্থানটি বড় অচেনা। এ পৃথিবীর কোনো দৃশ্য নয়। যেন হেঁটে হেঁটে পৃথিবীর বাহিরে চলে এসেছি আমি। অচেনা নক্ষত্র। দূরের গ্রহ। প্রাচীন ঘন বন। শূন্য প্রান্তরের কোণে দাঁড়িয়ে আছি আমি। তাকিয়ে আছি বনের ছায়ার দিকে। হঠাৎ হাওয়া উঠেছে। আমার শার্ট বাতাসে উড়ছে। চোখের সামনের চুলগুলি কানের পেছনে সরিয়ে নিলাম। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। আমি তখনো তন্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি মাঠের কোণে। বনের ভিতর থমকে আছে সময়। অন্ধকার আরো ঘনিয়ে আসছে সেখানে। লাল ইটের রাস্তা দিয়ে কেউ দৌড়ে চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে আছি মাঠের কোণে।
আমার বুকে স্লিং ব্যাগ। ব্যাগে কী আছে? আমি মনে করার চেষ্টা করলাম। কিছু টাকা। এলিয়েন কার্ড। কয়েকটা ক্যান্ডি। একটা চিরকুট। চিরকুটে একটা নাম লেখা - Angel Sapanta।
সাপান্তার সাথে আমার দেখা হয়েছিল ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে। সকালের ফুলের মতো সতেজ মেয়ে। মাথা ভর্তি ঘন কোঁকড়ানো চুল। মুড়িয়ে মুড়িয়ে পেছনে বাঁধা। গায়ের রং পরিষ্কার। ত্বক কমলার চামড়ার মতো স্মুথ, মসৃণ। তার চারপাশের বাতাস সুরভিত। চোখের কোণগুলো আকর্ষণীয়। পাতলা পাপড়ি। কালো প্যান্ট, পোলো শার্ট পরনে ছিল সেদিন।
সাপান্তাকে আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি। তার নাম্বারে আমি কলও দিয়েছিলাম। নাম্বার বন্ধ। এই বৃষ্টির মধ্যে, এই আদিম প্রাচীন বনে, এই আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে, এই সুলু সাগরের কোণে সাপান্তা বেরিয়ে আসবে। লাল ইটের রাস্তা দিয়ে। বৃষ্টি পড়ছে টপটপ করে। আমি লাল ইটের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। আমার গতি ধীর। বৃষ্টির মধ্যে এভাবে হাঁটা বেমানান। একটা বড় গাছের নিচে এসে দাঁড়ালাম আমি। গাছের মাথা আকাশ ভেদ করেছে। বড় বড় লম্বাটে পাতা। লাল মাটিতে পড়ে আছে তারার মতো অসংখ্য ফুল। সাদা রং।
আমার থাকার জায়গাটি পাহাড়ের ঢালে। বান্দিলান পাহাড়চূড়ার নিচে। একটা বনের ভিতরে। বাহির থেকে বোঝার উপায় নেই এখানে একটা হোস্টেল রয়েছে। এক ফরাসি মধ্যবয়স্ক পুরুষ এই হোস্টেলের মালিক। তার নাম অলিভার। যদিও তিনি এখানে থাকেন না। স্থানীয় ফিলিপিনো দুই নারী দেখাশোনা করেন। যারা নির্জনতা পছন্দ করেন, তারা এখানে লুকিয়ে যান কয়েক সপ্তাহের জন্য।
থাকার ঘরটি বাঁশ, কাঠ দিয়ে তৈরি। কুটিরের মতো। বাসিন্দা আমরা দুইজন। আমার মাথার ঠিক কাছে একটা মেয়ের বাংঙ্ক। মেয়েটির নাম লওরেন। তার পূর্বপুরুষদের আদি বাস ছিল বোর্নিও দ্বীপে। সাবাহ সেম্পোর্নাতে। এখন সেটি মালয়েশিয়ার অংশ। আজ হোস্টেলে শুধু আমি আর লওরেন। চারদিকে একদম নীরবতা। পাহাড়ের ঢালে আমাদের ছোট্ট কটেজ। চারপাশে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। পেছনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মাউন্ট বান্দিলান। একটি প্রাচীন আগ্নেয়গিরি, যেখানে বহু শতাব্দী ধরে এর কোনো অগ্ন্যুৎপাতের খবর নেই।
কাল তোমার প্ল্যান কী? লওরেন আমাকে জিজ্ঞেস করল।
আমি বললাম, তুমি আমাকে কোথাও নিয়ে যেও। তোমার তো মোটরবাইক আছে।
বিকালে আমি স্টিভেনসনের মাছের অস্থায়ী দোকানে বসে থাকি। সাথে স্টিভেনসনের স্ত্রী। তাদের খুনসুটি দেখি। ইন্টিমেট কথাবার্তা। কেউ কেউ স্কুটি থামিয়ে মাছ দেখতে আসে। স্টিভেনসনের স্ত্রী আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমার বয়স কত? আমি সন্ধ্যার পরে পাবে নাচতে যাই কিনা? সেখানে অনেক মেয়েদের খুঁজে পাব। আমাকে বলল, জানো, আইল্যান্ডের মেয়েরা সেরা। শহরের মেয়েদের থেকে আইল্যান্ডের মেয়েরা তোমাকে বেশি ভালোবাসবে।
তাদেরকে দেখে আমি মুগ্ধ হই। আমি দ্বিধার মধ্যে আছি। স্টিভেনসন আসলে কী! জেলে? মাছ বিক্রেতা? নাকি প্রেমিক পুরুষ?
আসলে স্টিভেনসন জীবনকে উপভোগ করছেন। স্টিভেনসনের মাছ দোকানের পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে রাস্তা চলে গেছে। ডানে মোড় নিলে বিচ রোড। রাস্তা শেষ হয়েছে একটা রিজের কাছে। পাথুরে রিজে দাঁড়িয়ে সাগর দেখা যায়। আমার সামনে সুদূর, সীমাহীন, সুনীল সমুদ্র। ডানপাশে একটা ডুমাগেতে। পেছনে আরেকটা আগ্নেয়গিরি, নাম তালিনিস। প্রায়ই অগ্ন্যুৎপাতের ছাই ছড়িয়ে দেয় আকাশে।
কয়েকটি মাইক্রোনেশিয়ান বোট সন্ধ্যার আলো পেরিয়ে সুলু সাগরে মাছ ধরতে চলে যাচ্ছে। সাগরের ওপর বিশাল একটা মেঘের টুকরো। সন্ধ্যার আলো সেখানে প্রতিফলিত হয়ে সাগরের পানিতে হারিয়ে যাচ্ছে। আকাশে কমলা ও অতিবেগুনি রঙের দ্যুতি। সন্ধ্যার নিভে আসা আলো। সামনে নীলাভ অন্তহীন সাগর। ঢেউ আছড়ে পড়ছে কোরাল পাথরের উপর। আকাশে কমলা ও বেগুনি রং মিলেমিশে একাকার। মেঘের ছায়া ছানি তৈরি করেছে সাগরের ওপরে।
আমি রিজের উপর বসে আছি পা নামিয়ে। পাশে আমার রেড হর্স। গান বাজছে, 'জ্যামাইকা ফেয়ারওয়েল'।
← Back to Travel Stories